ট্রেন্ডিং নিউজ

বৈদ্যুতিক গাড়ীর বহরে এবার কি তবে বাংলাদেশও নাম লেখালো?

কিভাবে IELTS-এ ভালো ফলাফল করবেন?

ইংরেজীতে “তাই না?” ব্যবহার করার কিছু সহজ টিপস!

খেয়ে আসুন আদিবাসীদের সুস্বাদু খাবার ”মুন্ডি”

তবে কি জাপানিজরা শীঘ্রই বিলুপ্তির পথে?

বৃহস্পতিবার ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮

তবে কি জাপানিজরা শীঘ্রই বিলুপ্তির পথে?

জাপানের শহরগুলো প্রায় পুরোপুরি অপরাধমুক্ত, তারা অসম্ভবরকমের পরিশ্রমী ও আদ্যোপান্ত ভদ্র জাতি, প্রচন্ডরকম পরিচ্ছন্ন ও সদাচারী। এত সব গুন জাপানীদের রয়েছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তাদের প্রজাতি পৃথিবী থেকে বিলুপ্তির পথে! জাপানিদের জনসংখ্যা এতটাই কমতির দিকে যে বিশেষজ্ঞরা ধারনা করছেন, আগামী আড়াই শত বছরের ভেতর পৃথিবীর বুক থেকে জাপানিদের পুরোপুরিভাবে বিলুপ্তি ঘটতে পারে। জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই আশংকা প্রকাশ করছিলেন যে জাপানের জনসংখ্যা দ্রুত কমবে। এর কারণ জাপানের খুবই নিম্ন জন্মহার। এছাড়া জাপানে অভিবাসনের হারও খুবই কম। অদূর ভবিষ্যতে জনসংখ্যার বাড়ার কোনো সম্ভাবনা তো নাই-ই, উপরন্তু কেবলই কমছে জাপানের জনসংখ্যা। ২০১৬ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জাপানের জনসংখ্যা এখন ১২ কোটি ৭০ লাখ। ২০৬০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা তিন ভাগের এক ভাগ কমে দাঁড়াবে মাত্র সাড়ে ৮ কোটিতে। সেই সঙ্গে বাড়বে প্রবীন মানুষের সংখ্যা।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০৬০ সাল নাগাদ জাপানের মোট জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশই হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী। এ মুহূর্তে জাপানই পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যাদের ৩০ শতাংশ লোকের বয়স ৬০ বছর। এর কারণ জাপানের তরুন প্রজন্মের মধ্যে যৌনাভ্যাস আশংকাজনকহারে কমছে। যার ফলে জন্মাচ্ছে না শিশু। এ বিষয়ে ২০১৩ সালে বিট্রেনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা একটা বিশাল কেইস স্টাডি প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, ৪০ বছর এর নীচে যতজন জাপানী আছে, তারা প্রায় কেউই গতানুগতিক সম্পর্ক (প্রেম-ভালোবাসা, নারী-পুরুষ বন্ধুত্ব, বিয়ে, সংসার, যৌনতা ইত্যাদি) এর ব্যাপারে উৎসাহী নয়।

জাপানের জনসংখ্যার নিম্নহারকে অন্যতম প্রধান জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। জাপানী সরকার তার জনগনকে জন্মহার কমে যাবার ব্যাপারে সাবধান করে যাচ্ছে বেশ কয়েক বছর ধরেই, কিন্তু তারা তাতে মোটেও কর্ণপাত করছে না। বরং তারা এটির জন্য মূলত সরকারই দায়ী বলে মনে করে থাকেন।

জাপান একটি ধর্মীয় মূল্যবোধমুক্ত দেশ। সুতরাং সেখানে তো খোলামেলা যৌনাচারে অভ্যস্ত রাষ্ট্র ( ফ্রি সেক্স কান্ট্রি) হওয়াই সঙ্গত ছিলো, কিন্তু খোলামেলা তো দূরের কথা, তারা কোন ধরনের যৌনকর্মেই আগ্রহী নয়।

Related image

অস্বাভাবিক হারে জনসংখ্যা কমে যাওয়াতে বিভিন্নরকম সামাজিক সমস্যা তৈরী হয়েছে জাপানে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হচ্ছে ‘কদোকুশি’ বা নিঃসঙ্গ মৃত্যু। মানে জীবনের শেষ বয়সে এসে তারা সম্পূর্ণ একাকী ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। আশির দশকেই মূলত এ সমস্যার সূত্রপাত। ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকায় এখন তা জাপানী সমাজে অতি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে প্রায় ৫০ লাখ বৃদ্ধ-বৃদ্ধা পুরোপুরিভাবেই একাকী জীবনযাপন করেন। যারা তাদের ছেলে-মেয়ে কিংবা অন্য কোনো আত্মীয়ের সঙ্গে থাকে, তারাও এক প্রকার নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করেন। ব্যাপারটা শুনতে খারাপ লাগলেও প্রকৃত সত্যিটা হলো, জাপানের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তাদের বয়স্ক জনগোষ্ঠির বোঝা বহন করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পেনশন ভোগীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যাকে যথাযথ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তাদেরকে বাড়তি মূল্য দিতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ অবস্থায় জাপান সরকার ইনকাম ট্যাক্স ৫ % বাড়ানো এবং অবসরের বয়স ৭০-এ নিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা-ভাবনা করছে যাতে করে সামাজিক নিরাপত্তা ও বয়স্ক ভাতা পদ্ধতির ওপর চাপ কমে।

অবশ্য বয়স্ক লোকেদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াটা কিছু প্রযুক্তি প্রতিস্ঠানের জন্য শাপে বর হয়েছে। কয়েকটি কোম্পানি তাদের বয়স্কদের সচল রাখার জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, যারা বয়সের ভারে একবারেই হাঁটতে পারেন না, তাদের জন্য জাপানে চালু করা হয়েছে রোবোটিক পা।

সম্প্রতী একটা গবেষণায় দেখা গেছে, জাপানের ৬৫% যুবক ও মধ্যবয়স্ক পুরুষ এবং ৫৩% যুবতী ও মধ্যবয়স্কা নারী বর্তমানে কোন ধরনের রোমান্টিক সম্পর্কে আবদ্ধ নেই। আরেকটা গবেষণায় আরো ভয়ংকর তথ্য জানা গেছে, জাপানে ৩০ এর নীচে বয়স এমন জনসংখ্যার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগই জীবনে কখনোই ডেটিং করেনি। এবং সেটা নিয়ে তাদের কোনই বিকার নেই, এমনকি নিকট ভবিৎষতেও কারো সাথে ডেটিং করার পরিকল্পনা তাদের নেই। যেখানে আমাদের দেশে ৩০ এর নীচেই একাধিক সন্তানের পিতা-মাতা হয়ে গেছে এমন ছেলেমেয়ের সংখ্যা অগুনতি!

জাপানে যেসব মেয়েদের বয়স ১৬-২৫, তাদের প্রায় ৫০% ই কোন ধরনের যৌন সম্পর্কে যেতে ইচ্ছুক নয়। ছেলেদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা ৩৫%। (সূত্রঃ জাপান পরিবার পরিকল্পনা এসোসিয়েশন)

এই প্রসংগে গত বছর প্রকাশিত হওয়া দৈনিক ইত্তেফাকের একটা সংবাদের অংশবিশেষ কোট করছি — জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে বলেন –জাপানে শ্রমিক সঙ্কট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। এটা কাটিয়ে উঠতে আমাদের প্রচুর বাচ্চা উৎপাদন করতে হবে। অধিক সন্তান নিতে নারীদের নানাভাবে উৎসাগিত করছে জাপান সরকার। এদিকে বাইরে থেকে শ্রমিক নেয়ার ব্যাপারেও আপত্তি আছে জাপানিদের।

জাপানের এই সংকটের কারণ, যৌনতার ব্যাপারে অনীহা আছে দেশটির জনগণের। বিশেষ করে নারীদের। নিজেদের ক্যারিয়ারের কথা ভাবতে গিয়ে বিয়েতে আগ্রহ থাকে না তাদের। শুধু তাই নয়, কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্কও স্থাপন করেন না তারা। আর এতেই জাপানের জাতীয় অর্থনীতি সঙ্কটে পড়তে শুরু করেছে। তাদের জনসংখ্যা এভাবে কমতে থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

জাপানে বর্তমানে ”অবিবাহিত অথচ প্রাপ্তবয়স্ক “ জনসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। এর ভেতর ৫০ লাখেরই বয়স হচ্ছে ৩৬ এর উপরে! এবং এদের সিংহভাগই ভার্জিন!

তাহলে মুটামুটি জাপানীদের সমস্যার চক্রটা হচ্ছে এমনঃ

জীবনযাত্রা অত্যধিক ব্যস্ততাপূর্ণ থাকে বিধায় তারা বিয়ে করতে চায় না > যার ফলে সন্তান উৎপাদন হয় না > যার ফলে জাপানে কাজ করার মতো স্থানীয় শ্রমিক ক্রমেই বিরল থেকে বিরলতর হচ্ছে > যার ফলে ইকোনমিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণে অভিবাসীদের ব্যাপক হারে স্বাগত জানানো ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা নেই। নইলে খুব শিঘ্রই উন্নয়নের চাকা পেছনের দিতে ঘোরা শুরু করতে পারে। অন্যদিকে আবার ইউরোপ ও আমেরিকার মতো সস্তা শ্রম গ্রহণে জাপানিরা বড়ই অনিচ্ছুক এবং তাদের জাতীয়তাবোধ প্রবল। তাই বাইরে থেকে শ্রমিক আমদানির ব্যাপারেও বেশীরভাগ কোম্পানিই অনীহা প্রকাশ করে। আবার অনেক কোম্পানি অটোমেশনে যাচ্ছে, রোবট দিয়ে কাজ চালাচ্ছে আবার যে সব কোম্পানিতে মনুষ্য শ্রমিক আছে, তাদের বেতন রীতিমতো আকাশচুম্বি, যেটা অনেক বড় কোম্পানিও পোষাতে পারছে না।

তবে শুধুই কি ব্যস্ততাপূর্ণ ক্যারিয়ার জীবন? গার্ডিয়ান পত্রিকা বলছে, না, এটিই একমাত্র কারণ নয়। আরো বড় কারণ রয়েছে। আসুন সেগুলো জেনে নেই।

যে সব কারণে জাপানীজ নারীরা কোন সম্পর্কে আবদ্ধ হতে চায় নাঃ

১) আপনি কি জানেন, জাপান পৃথিবীর অন্যতম জেন্ডার বায়াসড রাষ্ট্র? জাপানী সমাজে, বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য প্রবল। আমাদের দেশের বেশীরভাগ পুরুষদের মতই জাপানী পুরুষরাও মনে করেন নারীদের উচিত শুধুমাত্র ঘরকন্যা করা। বাইরের কাজ করার জন্য পুরুষরাই তো আছে। নারীদের দরকার কি? বিবাহিতা নারীরা চাকরী করলে জাপানি সমাজ তাকে ’ওনিয়মে’ (oniyome) মানে ”অশুভ স্ত্রী” বলে সম্বোধন করে।

২) পুরুষরা যেমন ছুটি পান, জাপানী মেয়েরা বিয়ের কারণে তেমন ছুটি পান না, বা পেলেও সেটা বেতনভুক্ত নয়, বা হলেও বেতনের পরিমান খুবই কম। বিয়ের পর জাপানী মেয়েদের প্রমোশনও হয় না খুব একটা, ওভারটাইম করতে পারেন না ছেলেদের মতো। আর গর্ভধারন করলে তো কথাই নেই। গর্ভবতী হবার পর তাদেরকে চাকরী থেকে ছাঁটাই করা হয় কারণ মেয়েরা তখন স্বভাবতইঃ দীর্ঘক্ষন অফিসে বা কারখানায় কাজ করতে পারে না, আবার অনেক সময় মেয়েরা নিজেইরা চাকরী ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। প্রায় ৭৫% জাপানী নারী তাদের প্রথম সন্তান প্রসবের পরেই চাকরী ছেড়ে দেয়। এই কারণে মেয়েরা মনে করে, বিয়ে করলেই তো তাকে চাকরী ছেড়ে দিতে হবে। আর চাকুরীদাতারা মনে করে, একটা মেয়ে বিয়ে করা মানেই সে কিছুদিন পর চাকরী এমনিতেই ছেড়ে দিবে। তাই বিয়ে করা মাত্রই মেয়েদেরকে ছাঁটাই করে দেয়া হয়।

৩) বয়ফ্রেন্ড বা স্বামীকে দেবার মতো যথেষ্ঠ পরিমান সময় তাদের হাতে নেই।

Image result for japan female group
৪) জাপানে প্রচলিত একটা পুরনো প্রবাদ হচ্ছে — ”বিবাহ হচ্ছে মেয়েদের জন্য কবরবিশেষ।” অনেক পরিবারে ছোটবেলা থেকেই মেয়েদেরকে এমন ধারনা দিয়েই বড় করা হয়।

৫) জাপানী আধুনিক নারীরা বিশ্বাস করেন, প্রেম-ভালোবাসা-বিয়ে-সন্তান-সেক্স এসবের কোন মানে নেই একজন মানুষের জীবনে। এসব মানুষকে কিছুই দেয় না। এগুলো স্রেফ বাহুল্য সামাজিক আচার। এসব ছাড়াই একজন মানুষ সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে। (অবশ্য এমনটা জাপানিজ পুরুষরাও ভাবেন)

৬) প্রায় ৯৪% জাপানিজ যুবতী নারী মনে করে, বিয়ে করার চাইতে অবিবাহিতা থাকা শ্রেয়। তারা মনে করে, সম্পর্ক ও ক্যারিয়ারের সফলতা কখনই একসাথে অর্জিত হতে পারে না। (সূত্রঃ জাপান জনসংখ্যা ও সামাজিক নিরাপত্তা পরিষদ।)

৭) জাপানি মেয়েরা আগের তুলনায় অনেক বেশী আত্ননির্ভরশীল এবং উচ্চাভিলাষী। তারা প্রেম-সংসার-বাচ্চা কাচ্চা এসবকে তাদের ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রধান অন্তরায় বলে ভাবেন। ইরি তমিতো নামে ৩৩ বছর বয়স্ক একটা মেয়েকে সাংবাদিকরা তার রিলেশনশীপের কথা জিগেস করাতে সে উত্তর দিয়েছিলো —

আমাকে একটি ছেলে তিন বছর আগে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলো। আমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম যখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে প্রেমের চাইতে আমার কাছে আমার চাকরীর প্রাধাণ্য বেশী। এরপর আমি ডেটিংয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। ক্যারিয়ারটাই আমার কাছে আমার জীবনের সবচাইতে গুরুত্ববহ জিনিস হয়ে ওঠে, এমনকি আমার পরিবার বা সম্পর্কের চাইতেও। এখন আমি একটি চমৎকার জীবন যাপন করছি। সপ্তাহান্তে আমার বান্ধবীদের সাথে আমি ঘুরতে বের হই, ফ্রেন্চ বা ইতালিয়ান রেস্তোঁরায় খেতে যাই, তারাও আমার মতই ক্যারিয়ার সচেতন। আমি দামী জামাকাপড় কিনি, দূরে কয়েকদিনের জন্য ছুটি কাটাতেও যাই। আমি আমার এই স্বাধীনচেতা জীবনটাকে বেশ উপভোগ করি। মাঝে মাঝে বারে গিয়ে এক রাতের জন্য আমার সাথে কোন পুরুষের প্রেম হয়, আমরা একসাথে রাতটা কাটিয়ে সকালে যার যার কাজে চলে যাই, পরবর্তীতে আমাদের কারোই আর কারোর কথা মনে কথা থাকে না। তবে সেখানে যৌনতার প্রাধান্য থাকে না, মাঝে মাঝে আমাকে বিবাহিত পুরুষরাও প্রস্তাব দিয়ে বসেন, যারা একটা নতুন সম্পর্ক খুজেঁ বেড়ায়। তারা ভাবে, যেহেতু আমি ব্যাচেলর, তাই আমি নিশ্চয়ই নতুন কোন সম্পর্কের জন্য মুখিয়ে আছি। মেনদুকুসাই! (ঝামেলার শেষ নেই!)

Image result for japanese people

৮) অপরদিকে জাপানিজ পুরুষেরা আগের যে কোন সময়ের চাইতে হয়েছে ক্যারিয়ারের বিষয়ে উদাসীন, কম বেতনের চাকুরে, সর্বোপরী তাদের আজীবন চাকুরির কোন নিশ্চয়তা নেই। সেখানে বিয়ে মানেই বাড়তি খরচ, আর সন্তান জন্ম দেয়া মানেই পরিবারে একটা বাড়তি মুখের আগমন।

৯) নারী-পুরুষ উভয়ই অনলাইন পর্ণ, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি পার্টনার, হেন্তাই, এনিম কার্টুন, ভিজুয়ালি সিমুলেটেড স্বমেহন ইত্যাদিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। মোটকথা, তারা এখন ভার্চুয়াী সেক্স করেই তৃপ্ত।

১০) গ্রামের দিকের লোকেরা ভালবাসা ও যৌনতার বদলে অন্যান্য অবসর বিনোদনকেই বেশী প্রাধাণ্য দিচ্ছে।

১১) অনেক সময় তারা মানসিকভাবে এতটাই চাপে থাকে যে, কোন ধরনের যৌনচিন্তা তাদের মাথাতেও আসে না, তাই বিপরীত বা সম — কোন লিংগই তাদেরকে কামোত্তিজিত করতে পারে না।

১২) বেশীরভাগ জাপানিজ যুবক যুবতী কোন ধরনের শারিরীক মিথষ্ক্রিয়া (ফিজিক্যাল ইন্টারেকশন) পছন্দ করেন না, এমনকি কেউ কেউ নাকি গায়ের সাথে অন্য কারো স্পর্শ লাগলেও প্রচন্ডভাবে চমকে উঠেন।

১৩) সম্প্রতি এক সামাজিক গবেষণায় জাপানের ২৯% কিশোর বলেছে, রক্তমাংসের নারীদেহের চাইতে রোবট নারীদেহ (যেমনঃ পাওয়ার রেঞ্জার্স) তাদের কাছে বেশী আকর্ষণীয় মনে হয়। এবং ৪৮% কিশোরী বলেছে, তারা জীবনে কখনো সন্তান ধারন করবে না।

১৪) জাপানে শিশুপর্ণ কিছুদিন কয়েক বছর আগেও বৈধ ছিলো। ২০১৪ সালে জাপানে child pornography এর উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তার মধ্যে জাপানিজ কার্টুন এনিমে ও ম্যাঙ্গাও ছিল কিন্তু ম্যাঙ্গা এনিমে লেখক ও এডিটরদের তোপের মুখে এনিমে ও ম্যাঙ্গা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা সড়িয়ে নেওয়া হয়েছে। জাপানের একটা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুন জনগোষ্ঠি কার্টুন ও কমিকসের আদলে শিশুপর্ণ দেখে ও পড়ে অভ্যস্ত, এটাও তাদের পরবর্তী জীবনে যৌন অনাসক্তির কারণ হতে পারে বলে সাইকোলজিষ্টরা মত প্রকাশ করেছেন।

কম জন্মহার, যৌনকাজে নিরাসক্তি ও নারী-পুরুষ বৈষম্য এসব তো অনেক দেশেরই বর্তমান বৈশিষ্ট্য। কিন্তু তিনটা বৈশিষ্ট্য আছে যেটা পৃথিবীর আর কোন দেশের নেই, শুধুমাত্র জাপানের আছে।

১) ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের অভাব যা জাপানীদেরকে বিয়ে করে বাচ্চা নিতে উৎসাহী করতে পারে।

২) ঘন ঘন ভূমিকম্প হবার প্রবণতা, যা জাপানীদেরকে সংসারী হয়ে থিতু হতে প্রবলভাবে নিরুৎসাহিত করে।

৩) জীবনযাত্রা ও সন্তান বড় করার খরচ আকাশচুম্বী।

এক সময় দেখা যাবে জাপানের সমাজ হয়ে গেছে সাই ফাই সমাজের মতো, যেখানে যুব সমাজ তাদের জীবদ্দশায় কখনোই বিয়ে করে না।

আছাদা নামের ২৩ বছর বয়স্ক ভার্সিটিপড়ুয়া একজন জাপানীজ তরুনী বলেন,

”তিন বছর আগেই আমি ডেট করা ছেড়ে দিয়েছি। প্রেম বা যৌনতার প্রতি আমি একেবারেই আগ্রহবোধ করি না, এমনকি আমার কারো হাত ধরতেও ভালো লাগে না। আমি গত আড়াই বছর ধরে একটা ভারচুয়াল গেইমে ভীষনভাবে আসক্ত, ঐ গেমের ভেতর আমাকে একটা মিষ্টির দোকানের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতে হয়। এবং আমি সেটা এতটাই উপভোগ করি যে, যৌনতাসম্পর্কিত কোন ভাবনা কখনোই আমার মনে বা মাথায় আসে না। আর আমার কল্পনার আদর্শ নারী হচ্ছে প্রচন্ডরকম মিষ্টি দেখতে আর কুমারী, যে কখনো সেক্স বা বিয়ে করেনি। আমি এমনটা হতে চাই এবং আজীবনই তেমন থাকতে চাই।”

এমন না যে আমি নারীদেরকে যৌনাবেদনমযী মনে করি না, কিন্তু আমি যৌনতা ছাড়াও বাচঁতে শিখেছি। আসলে একটা আবেগতাড়িত সম্পর্ক খুবই জটিল বিষয় – বল্লেন শাতরু কিসিনো (৩৭)

জাপানের পরিবার পরিকল্পনা পরিষদের প্রধান ’কুনিয়ো কিতামুরা’ জানালেন, আমাদের আর্কাইভে জাপানী মেয়েদের চাইতে ছেলেদের তথ্য বেশী। কারণ জাপানী মেয়েরা যৌনতার বিষয়ে ছেলেদের চাইতে অনেক বেশী নিরাসক্ত। আমরা মনে করি, যৌনতা বিষয়টি শুধুমাত্র পুরুষকেন্দ্রিক। মেয়েরা অতটা যৌনতাড়না বোধ করে না, যতটা ছেলেরা করে।”

জাপানিজ বংশোদ্ভুত আমেরিকান লেখক রোনাল্ড কেল্টসের মতে, ”আমি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ যে, অদূর ভবিৎষতে জাপানিদের সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে প্রযুক্তি। জাপানীরা তৈরী করেছে অসম্ভব জটিল ভার্চুয়াল দুনিয়া, এবং অনলাইন যোগাযোগ ব্যবস্থা। জাপানের মোবাইল এপগুলো হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে সৃজনশীল আর স্বতন্ত্র। এটাই তো হবার কথা, কারণ জাপান একটা ছোট্ট দ্বীপ, অথচ সেই দ্বীপের জনসংখ্যা তো বিশাল। সেখানে বড় একটা জনগোষ্ঠিকে অল্প জায়গার ভেতর থাকতে হয়, তাই তাদের আরো বেশী ব্যাক্তিগত, গোপনীয় ও বিশেষায়িত একটা জায়গা দরকার, আর ভারচুয়াল দুনিয়া তাদেরকে সেই সুবিধাই দিচ্ছে। তবে শুধু জাপান নয়, বাকী পৃথিবীও ক্রমান্বয়ে সে দিকেই যাচ্ছে।”

জাপান সরকার সেক্স ও রিলেশনশীপ বিশেষজ্ঞ বাড়াচ্ছে, যাদের মূল উদ্দেশ্য হলো জাপানী জনগনকে যৌনতা ও সংসারজীবনে উৎসাহিত করা। তারা বোঝাচ্ছে — মানুষজন যে ধীরে ধীরে অনুভূতিশূণ্য ও শারীরিকভাবে বিযুক্ত হয়ে পড়ছে, এটা কোনভাবেই স্বাস্থ্যসম্মত জীবন চর্চার পরিচায়ক নয়। অপর একজন মানুষের সাথে যৌনকর্ম করা একজন মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা যেটা শরীর ও মনে সুখকর হরমোন নিঃসরিত করে, এবং মানুষকে জীবনে উন্নতি করতে সাহায্য করে।

যৌন সমস্যার পাশাপাশি জাপানের আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে সেখানে আত্মহত্যার সংখ্যা খুবই বেশি। শুরুতে আত্মহত্যাকে এক প্রকার সম্মানের চোখে দেখা হলেও দিনে দিনে এটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জাপানীরা নিজেদের কথা নিজেদের কাছে রাখতেই পছন্দ করে। যদি কেউ কখনো তাদের সমস্যাগুলো অন্যদের সাথে আলোচনা করে তখন তাকে অসামাজিক মনে করা হয়। প্রচন্ড কাজের চাপ, নিজেকে প্রকাশ করতে না পারা, আরো নানা বিধ কারণে জাপানীরা অনেকেই ক্রনিক মানসিক সমস্যায় ভোগে। আর এই বিষয়ে কারো সাথে খোলাখুলি ভাবে কথা বলতে না পারার কারণে প্রচন্ড মানসিক চাপে এক সময় তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। জাপানে প্রতি বছর গড়ে ৩০ হাজার লোক আত্মহত্যা করে, যার ভেতর পুরুষের সংখ্যা বেশী। সরকার এই আত্নহত্যা নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আইন জারি করেছে কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয়নি। এমনকি বিখ্যাত মাউন্ট ফুজি’র পাদদেশে অবস্থিত আওকিগাহারা বনের দুর্নামই হয়ে গেছে “আত্নহত্যার বন” হিসেবে! তবে জাপানের আত্নহননের সংখ্যা গত কয়েক বছর ধরে দ্রুত কমছে।

সর্বোপরি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌন কাজে প্রচন্ড অনীহার কারণে জাপানের জনসংখ্যা বাড়ছে না, অপরদিকে যারাও বা আছে তারাও আত্নহত্যা প্রবণ। এই দুইয়ের মিশেল জাপানকে একটা সময় অচিরেই ঠেলে দেবে পৃথিবী থেকে বিলুুপ্তির পথে, যদি না জাপান সরকার বড় ধরনের কোন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না নেয় – খুব বেশী দেরী হয়ে যাবার আগেই।

দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা অবলম্বনে।

ছবিঃ দ্য গার্ডিয়ান, গুগল ডট কম।

 

Comments

মন্তব্য করুন

এই বিভাগের অন্যান্য পোস্ট