ট্রেন্ডিং নিউজ

বৈদ্যুতিক গাড়ীর বহরে এবার কি তবে বাংলাদেশও নাম লেখালো?

কিভাবে IELTS-এ ভালো ফলাফল করবেন?

ইংরেজীতে “তাই না?” ব্যবহার করার কিছু সহজ টিপস!

খেয়ে আসুন আদিবাসীদের সুস্বাদু খাবার ”মুন্ডি”

তবে কি জাপানিজরা শীঘ্রই বিলুপ্তির পথে?

বুধবার ২৪ এপ্রিল, ২০১৯

বৈদ্যুতিক গাড়ীর বহরে এবার কি তবে বাংলাদেশও নাম লেখালো?

কল্পনা করুন, আপনি ফার্মগেটের সিগন্যালে বসে আছেন আপনার গাড়ীর ভেতরে। আপনার গাড়ীর ড্যাশবোর্ড জানান দিচ্ছে যে তার চার্জ প্রায় শেষ। যে টুকু বাকী আছে সেটুকু দিয়ে বড়জোর বাংলা মটর পযন্ত যেতে পারবেন। আপনি একটুও বিরক্ত না হয়ে কাওরান বাজারের আন্ডারপাসের সামনে এসে আপনার গাড়ীটি পার্ক করে পাশের চার্জিং স্টেশন থেকে চার্জ দেয়া শুরু করলেন, আপনার মোবাইলটিকে যেভাবে চার্জ দেন আর কি!

না, এটা কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়, প্রিয় পাঠক। খুব শীঘ্রই উন্নত দেশ গুলোর মত ঢাকাতেও আপনি নিজের চোখেই দেখতে পাবেন এই ধরনের দৃশ্য। আর এই ধরনের গাড়ীগুলোকে বলা হয় “প্লাগ ইন ভিহিকল”। বৈদ্যুতিক গাড়ীর ইতিহাস শত বছরের পুরনো, তবে প্রথম একে কর্মাসিয়াল রূপ দেয় আমেরিকার জেনারেল মটর্স, আর একে সর্বাধুনিক ডিজাইনে ও প্রযুক্তি নিয়ে প্রথম বৈদ্যুতিক স্পোটর্স কার হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে টেসলা, ২০০৬ সালে। এর নাম ছিলো রোড স্টার, এই সিরিজের প্রায় সবগুলো গাড়ীর দাম ছিলো ১ লাখ ডলারের কাছাকাছি। বাজার আসে ২০০৮ সালে।

বিশ্বব্যাপী মোটর গাড়ী শিল্প এবং প্রযুক্তি ধীরে ধীরে কিন্তু একটি বৈদ্যুতিক বিপ্লবের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে – বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি), আরো বিশেষভাবে বলতে গেলে, প্লাগ-ইন যানবাহন, বর্তমান উৎপাদন প্রবৃদ্ধি মোতাবেক, ধারনা করা হচ্ছে যে, ২০৩০ সাল নাগাদ এই পৃথিবীতে যতগুলো গাড়ী রাস্তায় চলাচল করবে, তার প্রায় তিন ভাগের এক ভাগই হবে বৈদ্যুতিক যানবাহন।

বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৩০ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ী আছে, এর ভেতর প্রায় ২০ লাখ গাড়ীই চায়নায় বানানো হয়েছে এবং চায়নাতেই সেগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বছরের প্রথম ৬ মাসের ভেতর চায়নাতে বৈদ্যুতিক ও নন-পেট্রোল গাড়ীর উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫ লাখ! এবং সংখ্যাটা ক্রমেই বাড়ছে।

বৈদ্যুতিক গাড়ীর প্রতি কেন বিশ্ব আবার নতুন করে ঝুঁকছে?  এর মূল কারনগুলো হলো, বায়ু ও শব্দ দূষণ, সরকারী আইন, সামাজিক মনোভাব ও দ্রুত প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ। তাছাড়া মানুষের চাহিদাতেও বদল এসেছে, তরল-জ্বালানী চালিত গাড়ীগুলো বায়ু, শব্দ দূষন আর জ্যাম – তিনটাই বাড়াচ্ছে। অপরদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ীতে বায়ু দূষন আশ্চর্যরকম কম, শব্দদূষন হয় না বল্লেই চলে আর জ্যাম কমাতেও রাখবে কার্যকরী ভূমিকা। ইঞ্জিনের ডিজাইন ও আকারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন হচ্ছে আগামীদিনের ইভিতে। তার মানে কম জাগায় বেশী যাত্রী ও মালামাল আঁটানো যাবে ছোট একটা গাড়ীর ভেতরও। এতে করে রাস্তায় মোট গাড়ীর অনুপাত কমে যাবে, ফলে কমবে জ্যামও।

অষ্ট্রেলিয়া, কোরিয়া, জাপান, নেদারল্যান্ড, স্পেন এসব দেশগুলো ইভি গাড়ীর বিক্রির জন্য একটা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করেছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স ২০৪০ সালের মধ্যে তাদের দেশের সমস্ত গাড়িকে বৈদ্যুতিক ও জিরো এমিশন কার বানিয়ে ফেলবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। শুধু ব্যাক্তিগত গাড়ীতেই না, এই বদল আসবে বাস, ট্রেন, এরোপ্লেন এমনকি স্পেসশীপেও।

এই ধরনের ব্যাপক পরিবর্তন সাধারণত বছরের পুরো সময়টা  এক রকম ভাবে হয় না, তবে এটি পেট্রল গাড়ীর কোম্পানি এবং সাধারণ ভোক্তা উভয়ের জন্যই এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সময়। একটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব চোখের সামনে হওয়াটাও তো একটা অসাধারন অভিজ্ঞতা, এই রকম অভিজ্ঞতা তো আর সব সময় হয় না সবার!

অবশেষে আমাদের অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি বৈদ্যুতিক গাড়ীর আমদানি করের বিষয়টি পরিস্কার করেছেন, সুতরাং বাংলাদেশে আপনি এখন অচিরেই বৈদ্যুতিক গাড়ী  কেনার এবং চালানোর কথা ভাবতে পারেন।

অতরল-জ্বালানী চালিত (যেমন বিদ্যুৎ ও প্রাকৃতিক গ্যাস) গাড়ীর চাহিদা আগামী দশকগুলোকে হু হু করে বাড়বে। গত দশকে ছিলো হাইব্রিড গাড়ীর ম্যানুফ্যাকচারিং করার জোয়ার, এই দশক ও আগামী দশকে হবে বৈদ্যুতিক গাড়ীর জোয়ার। এই কারণেই ফোর্ড, টেসলা, ফিয়াট, মার্সিডিজ বেঞ্চ, অডি, বিএমডব্লিউ, নিশান ও ভলবোর মত ডাকসাইটে গাড়ী প্রস্ততকারক প্রতিষ্টানগুলো বেশ কয়েকটি আধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ী বাজারে ছাড়ছে গত কয়েক বছর ধরে।

মোটর গাড়ীর ইঞ্জিনকে গত প্রায় তিন দশক ধরে গবেষণা করেও ২৫-৩০% এর বেশী সুদক্ষ করা যায়নি। আর হয়তো কখনো যাবেও না। তাহলেই বুঝুন কি পরিমান মূল্যবান তেল/গ্যাস আমরা এতটা বছর ধরে অপচয় করে গেছি গাড়ীর পেছনে! তার উপর পরিবেশ, জীবাশ্ন জ্বালানী আর খরচের কথা আমলে নিলে, মোটর গাড়ীর ঐহিত্যবাহী কমবাস্টন ইঞ্জিন বেশ আত্নঘাতি বলা চলে। সারা বিশ্ব ক্রমেই পরিবেশের ব্যাপারে সচেতন হচ্ছে, এই হাওয়া এখন উন্নত বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশেও লাগছে। তাছাড়া মাটির নীচের সম্পদ তো অফুরন্ত নয়, এটি এক সময় না এক সময় অবশ্যই শেষ হবে। এটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, জীবাশ্ন জ্বালানীর উপর ভিত্তি করে বিশ্ব রাজনীতির কলকাঠি নড়েছে এই মাত্র কয়েকটা বছর আগেও। এ কথা সবাই জানেন। তবে মধ্যবিত্তদের জন্য সবচেয়ে বড় আশার কথা হলো, বৈদ্যুতিক গাড়ীর খরচ তেল বা গ্যাসে চালিত গাড়ীর চাইতে অনেক কম ও সাশ্রয়ী। এই কারণেই, নিজেদের সিএনজি বা পেট্রোল চালিত গাড়ীগুলোকে বৈদ্যুতিক গাড়ীতে রূপান্তরিত করাটাই হবে ঢাকা শহরের গাড়ী মালিকদের নেক্সট হাইপ!

তবে আমরা যদি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই পরিবেশ ও জলবায়ুর কথা চিন্তা করি, তাহলে এই মূহুর্তে বৈদ্যুতিক গাড়ীর চাইতে ভালো কোন বিকল্প আমাদের যানবাহন ও রাস্তার জন্য আদতে নেই, যাদের মূলমন্ত্র পরিস্কার আবহাওয়া, দূষণমুক্ত বাতাস, কম শব্দদূষণ, তারা অচিরেই বৈদ্যুতিক গাড়ীর কথা চিন্তা করবে প্রথাগত জীবাশ্ন জ্বালানী (তেল-গ্যাসে) চলা গাড়ীর কথা বাদ দিয়ে।

আমাদের দেশেও পরিবেশ বান্ধব গাড়ীর চাহিদা বাড়ছে, এর প্রতি গন মানুষের আগ্রহও বাড়ছে, আমাদের দেশের রিকন্ডিশন আর ব্র্যান্ড নিউ মার্কেট উভয়েই হাইব্রিড গাড়ির বিক্রি বাট্টা হয়েছে বেশ ভালো, যদিও এ ধরনের গাড়ীগুলো আমাদের দেশের বাজারে এখনো ততটা সুলভ ও জনপ্রিয় হয়নি। চলতি বছরের অর্থবাজেট বৈদ্যুতিক গাড়ী ও গ্যাসোলিন-চালিত হাইব্রিড গাড়ীর মাঝে একটা মোটা দাগ টেনে দিয়েছে,  আশা করা হচ্ছে তাদের দাম কমবাষ্টন ইঞ্জিনচালিত গাড়ীর চাইতে কম হবে। তবে আপনি যা-ই বিশ্বাস করেন না কেন, আমাদের বৈদ্যুতিক পাওয়ার গ্রিড গত কয়েক বছরে বেশ কয়েক ধাপ এগিয়ে গেছে, এ কথা মানতেই হবে। পাওয়ার আউটেজ এখন অনেক কম, সে তুলনায় এর বিস্তৃতি আগের চাইতে অনেক বেশী। এসব উন্নয়ন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে এই দেশের ভবিৎষত ইভি অবকাঠামোতে।

ঢাকা শহরের কথা যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে এ কথাতে কেউ দ্বিমত করবে না যে এই শহরের বায়ু অনেক বছর আগেই দূষণমাত্রার সীমা ছাড়িয়েছে। বায়ু দূষণে এই নগরী অদ্বিতীয়। এহেন অবস্থায়, বৈদ্যুতিক গাড়ী দূষণের মাত্রাটা একেবারে বন্ধ করতে না পারলেও কমিয়ে আনতে পারবে অনেকাংশেই।

বৈদ্যুতিক গাড়ীর খরচ তুলনামূলক কম, তার উপর এটা পরিবেশে সরাসরি কোন খারাপ প্রভাব রাখছে না। তবে হ্যাঁ, গত কয়েক দশক ধরে ব্যাটারি সেল প্ল্যান্ট থেকে নিঃস্বরিত কার্বন ডাই অক্সাইড, কয়লা খনিতে ব্যবহৃত শিশুশ্রম, ইত্যাদি নিয়ে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বয়ে চল্লেও বেশীরভাগ বোদ্ধাই আপাততঃ উত্তম সমাধানটা বলতে বৈদ্যুতিক যানকেই মেনে নিয়েছেন প্রায় এক বাক্যে। কিন্তু কিছু কট্টর সমালোচনাকারী এটা মানতে নারাজ যে, ইভির জন্য ব্যাটারি সেল বানাতে জীবাশ্ন জ্বালানী লাগছে ঠিকই, কিন্তু গাড়ীটা স্বয়ং চালাতে তো আর জীবাশ্ন জ্বালানী লাগছে না।

সুতরাং, আমার দেশের রাস্তা আর আবহাওয়া তো দূষণমুক্ত থাকছে। পুরো দেশের সব রাস্তার বায়ু দূষিত করার চাইতে একটা ছোট্ট প্লান্টের একটা নির্দিষ্ট জায়গার আশেপাশের বায়ু দূষণ করা কি শ্রেয় নয়? তাছাড়া, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলতঃ গ্যাসভিত্তিক। গ্যাস হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটা পরিস্কার উৎস, অপরদিকে কয়লা হচ্ছে একটা নোংরা উৎস। পরিবেশের বারোটা বাজায়, কার্বন এমিশন করে গ্রিন হাউজ ইফেক্টে ভূমিকা রাখে, গ্যাস দিয়ে ব্যাটারি সেল বানানো কয়লা শক্তি দিয়ে বানানো ব্যাটারি সেলের চাইতে অধিকতর পরিবেশবান্ধব। আমেরিকাতে টারবাইন দিয়ে, আমাদের দেশে কাপ্তাইতে পানির স্রোত দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এসব এখন পযন্ত আবিস্কৃত বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচাইতে নিরাপদ পদ্ধতি। মানুষ যত বেশী এই পদ্ধতিগুলোকে উন্নত করবে, ইভি তত বেশী পরিবেশ বান্ধব হতে পারবে।

এই কারণেই প্রযুক্তিবিদরা, পরিবেশবাদীরা ও গাড়ী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো জীবাশ্ন জ্বালানী বিহীন গাড়ী প্রস্তুত করতে উঠে পড়ে লেগেছেন। আমাদের ভবিৎষত প্রজন্মের সুস্থ্যভাবে বেচেঁ থাকার জন্য এখনই আমাদের উচিত আমাদের সমস্ত শ্রম বৈদ্যুতিক গাড়ী ও এর উন্নতিকরণে বিনিয়োগ করা।

ফেসবুকে সম্প্রতী টাংগুয়ার রেসিং নামে বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ফেসবুক পেইজ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তারা অচিরেই একটি রোড মার্চ এবং বিশ্বব্যাপি ট্যুরে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। এই কারণে তারা একটি অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক গাড়ী বানাচ্ছে। তাদের ফেসবুক পেইজ থেকে জানা গেলো –”কোন জীবাশ্ম জ্বালানী ছাড়াই টাঙ্গুয়ার রেসিং দল তাঁদের বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি নিয়ে পুরো দেশ এবং সারা বিশ্ব পাড়ি দিতে প্রস্তুত হচ্ছে। এই ভ্রমণ ২০১৯ সালে শুরু হবে। এই যাত্রা সম্ভব হবে কি “?

উল্লেখ্য, ১২ ই ডিসেম্বর ২০১৮ ইং দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে এক বর্ণাঢ্য প্রেস কনফারেন্সে তারা বিষয়টি অফিসিয়ালি ঘোষণা করেন।

হয়তো অনেকেই জানেন যে এই মূহুর্তে ঢাকার বুকে দুই দুইটি টেসলা এস মডেলের গাড়ী চলছে। আমরা যতটুকু শুনেছি যে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মর্ডান ইলেকট্রিক গাড়ী নিয়ে তারা কোন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে না। তার মানে হচ্ছে, ঢাকার অবকাঠামো ও প্রযুক্তি বৈদ্যুতিক গাড়ীর জন্য মোটেও অন্তরায় নয়। আপনি নিদ্বির্ধায় আপনার গাড়ীটিকে বৈদ্যুতিক গাড়ীকে রূপান্তরিত করতে পারেন, সামর্থ্য থাকলে বৈদ্যুতিক গাড়ীও কিনে ফেলতে পারেন একটা, তবে মনে রাখতে হবে, আপনার ইলেকট্রিক গাড়ীকে রিচার্জ করতে চিকন পিনের নোকিয়া চার্জার খুজঁতে যাবেন না যেন।

 

 

লেখাঃ  প্রলয় হাসান

Comments

মন্তব্য করুন

এই বিভাগের অন্যান্য পোস্ট