যে ১০ টি কারণে আপনার আইফোনটিকে জেলব্রেক করা উচিত হবে না!

আইফোন জেল ব্রেকিং এর অপকারিতা নিয়ে অনেকেই বেশ কিছু দিন থেকে লেখার জন্য আমাকে অনুরোধ করে আসছেন। সময় করে উঠতে পারছিলাম না। এই বেলা হাতে কিছু সময় পাওয়াতে ভাবলাম লিখে ফেলি।

ভূমিকাঃ কোটি কোটি ব্যবহারকারীর কাছে আইফোন যেমন আছে তেমনি পছন্দ। মানে তাদের হাতে এ্যাপল যে অবস্থায় আইফোন তুলে দিচ্ছে, তারা তাতেই খুশী। বাড়তি খুব বেশী কিছু তাদের চাহিদার তালিকায় নেই। আইফোনের ইন্ড্রাষ্ট্রি মানের নিরাপত্তা, আউটলুক আর স্ট্যাবিলিটি, এ্যাপ স্টোরে লাখ লাখ ফ্রি এ্যাপ ইত্যাদি যেমনটা এ্যাপেল দিয়েছে সেটাই বেশীরভাগ লোকের কাছে পারফেক্ট। কিন্তু কিছু লোক আছেন যারা এতেও খুব একটা সন্তুষ্ট নন। তারা বিশ্বাস করে যে, এ্যাপেল তাদের উপর কিছু বাড়তি বাধ্যবাধকতা ‘চাপিয়ে দিয়েছে’ এবং জেল ব্রেক করে তারা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। সেই অসন্তুষ্ট লোকগুলো হচ্ছেন, জেল ব্রেকাররা। আর তাদের সাথে এ্যাপেল সেই ২০০৭ এর জুলাই থেকেই ইঁদুর-বেড়াল খেলে আসছে। বলা বাহুল্য, ২০০৭ এর জুলাইতে প্রথম আইফোন রিলিজ করা হয়।

জেলব্রেক কি? সহজ ভাষায়, জেল ব্রেক হচ্ছে আইফোনকে তার স্বভাবজাত সুরক্ষার বেষ্টনি থেকে বের করে নিয়ে এসে সেটাকে দিয়ে সেইসব কাজ করানো যেসব করার জন্য তাকে বানানো হয়নি। জেলব্রেকিং হচ্ছে এক ধরনের হ্যাকিং। আর এ কথা সবাই জানেন যে, হ্যাকিং মানেই হচ্ছে অবৈধ অনুপ্রবেশ। জেলব্রেক তথা হ্যাকিং আইফোনকে এমনসব কাজ করতে বাধ্য করে যেটা করলে আইফোনের সফটওয়্যার বা হার্ডওয়্যারের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা থাকে। জেলব্রেক মানেই হচ্ছে এ্যাপল যেসব লিমিটেশন বেধেঁ দিয়েছে, সেগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে আইফোনের সফটওয়্যারকেই বদলে ফেলা। মূল লিমিটেশন হচ্ছে, এ্যাপলের এ্যাপ স্টোর বাদে অন্য কোন এ্যাপ স্টোর থেকে এ্যাপ্লিকেশন নামানো যায় না। জেলব্রেক এই লিমিটেশন ভেংগে ফেলে। [তাই বলে আবার ভাববেন না যে, জেলব্রেক করে এন্ড্রয়েড এ্যাপও আইফোনে চালাতে পারবেন।]

যিাযায

কেন জেলব্রেকঃ জেলব্রেকারদের হতাশাটা বেশ বোঝা যায়। তারা ইচ্ছেমতো এ্যাপ ইনসটল করতে পারে না, আইফোনের চেহারা (লক স্ত্রিন এবং ওয়ালপেপার) বদলাতে পারে না [আমার কাছে তো বরং জেলব্রোকেন আইফোনের চেহারা বেশী বিচ্ছিরি লাগে দেখতে], পেইড এ্যাপ ফ্রি তে কিনতে পারে না ইত্যাদি। যদিও প্রথমদিকে শুধু ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোডের নিয়ন্ত্রন নিতেই জেলব্রেকের সূচনা। তবু জেলব্রেক করে মূলত এই কটি কাজই করা হয়।

মোদ্দা কথা হচ্ছে, এ্যাপেল আপনাকে যা যা করতে দিবে, আপনি ঠিক তাই তাই করতে পারবেন। এতে যদি আপনার না পোষায়, তবেই জেলব্রেক করুন। অনেকে আবার জেলব্রেকের সাথে আইফোন আনলক করাকে গুলিয়ে ফেলেন। দুইটা সম্পূর্ণ দুই জিনিস। প্রথমটা ঐচ্ছিক। ২য় টা বলতে গেলে অবশ্যকরনীয়।

আপনি জেল ব্রেক করতেই পারেন। কারন ফোনটা আপনার, সেটা দিয়ে আপনি যা খুশী তাই করবেন, কার তাতে কি? কিন্তু তবু, জেল ব্রেকিংকে আমি ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করি। তাই সকল আইফোন ব্যবহারকারীকেই এটা করতে ‘নিরুৎসাহিত’ করি।

এর কারনগুলো নিচে ব্যাখা করলামঃ

১) সিকিউরিটির বারোটা বাজেঃ জেলব্রেক আইফোনের নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। অনেকেই জানেন যে, এ্যাপলের পণ্যে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোন ধরনের ছাড় দেয়া হয় না। এবং অন্য যে কোন পণ্য বা সার্ভিসের তুলনায় এ্যাপলের নিরাপত্তা শতগুনে ভালো। জেলব্রেক করার ফলে এই নিরাপত্তা যে কতভাগে ব্যহত হয়, আপনি তা চিন্তাও করতে পারবেন না।

একটু ব্যাখা করি। জেলব্রোকেন ফোন SSH বা Secure Shell কে চালু করে দেয়। SSH হচ্ছে এক ধরনের ক্রিপটোগ্রাফিক নেটওয়ার্ক প্রটোকল যেটা মূলতঃ দুটো নেটওয়ার্কড ডিভাইসের মধ্যে তথ্যের নিরাপদ আদান প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হয়। সোজা বাংলায় এর মানে হচ্ছে, বাইরে থেকে যে কোন মানুষ যে কোন এ্যাপ দিয়ে আপনার আইফোনে সংরক্ষিত যে কোন তথ্য চুরি করে নিয়ে যেতে পারবে, আপনার অজান্তেই। SSH কে ডিজাইন করা হয়েছে Berkeley এর মতো কুখ্যাত প্রটোকলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে, যেটা গোপন তথ্য; বিশেষ করে পাসওয়ার্ডকে চালান করে দেবার ব্যাপারে রীতিমতো সিদ্ধহস্ত। এবং সেটা করা হয় একদম প্লেইন টেক্সট হিসেবে।

ৃ

অনেকেই জানেন যে, যে কোন পাসওয়ার্ড সাধারনত এনক্রিপটেডভাবে সংরক্ষন করা হয়, ব্যবহারের সময় সেটাকে শুধু ডিকোড করা হয়। কিন্তু ম্যানুপুলেটেড Secure Shell আপনার পাসওয়ার্ডকে প্লেইন টেক্সট ফরম্যাটে সংরক্ষন করে। যার ফলে, সেটার গোপনীয়তা বা নিরাপত্তা যাই বলুন না কেন, কিছুই আর অবশিষ্ঠ থাকে না। প্লেইট টেক্সট মানে আপনি কি বোর্ডে যেভাবে টাইপ করবেন, আপনার পাসওয়ার্ডটিকে সে হুবহু সেভাবেই তার গুরুর কাছে চালান করে দিবে। যার ফলে আপনি যদি ইউনিকোড বেইসড পাসওয়ার্ডও ব্যবহার করেন, জেলব্রোকেন আইফোন থেকে সেটাও অনায়াসে ধরতে পারা যাবে।

অপরীক্ষিত এ্যাপ ডেভেলপারদের বানানো এ্যাপ ব্যবহার করার ঝুকিঁ নিয়েই আপনি যেহেতু জেলব্রেক করেছেনে সেহেতু আপনার ফেসবুকের ইউজার নেম, পাসওয়ার্ড বা ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড নাম্বার ইত্যাদি তো বটেই, এমনকি জেলব্রোকেন ফোন আপনার উপর সরাসরি গোয়েন্দা নজরদারি করার ক্ষমতাও রাখে। অথবা আপনাকে ফাসিঁয়ে দিতে পারে যে কোন গুরুতর অপরাধের সাথে। নিদেনপক্ষে আপনার আইফোনে পাঠিয়ে দিতে পারে ভয়াবহ কোন ভাইরাস। ইউরোপে এ ধরনের বেশ কয়েকটি ঘটনা বিশ্বমিডিয়াতে এসেছে। একটি নমুনা-ঘটনা দেওয়া হলো।

জেলব্রোকেন এ্যাপ আপনাকে না জানিয়ে আপনার ফোন থেকে ছবিসহ ইত্যাদি জিনিস সরিয়ে ফেলতে পারে। এক কথায়, আপনার ‘ব্যক্তিগত নিরাপত্তা’ বলতে কিছু থাকবে না।

জেলব্রেক এ্যাপলের নিরাপত্তার স্তর ভেংগে ফেলে বলেই পেইড এ্যাপ ফ্রিতে ব্যবহার করার সুযোগ দিতে পারে যেটা আদতে কোন সুবিধা নয়, অসুবিধা। কারন কয়েকটা পয়সা বাচাঁনোর জন্য জেনে শুনে আপনার শখের দামী ফোনটাকে বিপদের মুখোমুখি করছেন।

এমনটা যে হবে এ কথা হলফ করে বলছি না, কারন বছরের পর বছর ধরে জেলব্রেক করেও কারো হয়তো বড় ধরনের কোন ক্ষতি হয়নি কিন্তু ইংরেজীতে একটা কথা আছে, past performance is no guarantee of future results. অতীতে হয় নাই বলে যে ভবিৎষতেও হবে না, এ কথা নিশ্চিত করে কেইবা বলতে পারে?

২) ওয়ারেন্টি বাতিল হয়ে যায়ঃ জেলব্রেক করলে আইফোনের ওয়ারেন্টি বাতিল হয়ে যায়। জেলব্রেক করার মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী তার ও এ্যাপেলর মধ্যে যে চুক্তি হয় তা লঙ্ঘন করেন। কারন এ্যাপলের পণ্য কেনার সময় এবং iOS ইন্সটল করার সময় কিছু সংবিধিবদ্ধ শর্তাবলী মেনেই আমরা তা করে থাকি। সেখানে বলা আছে, আইফোনের সফটওয়্যারে যদি কোন ধরনের কোন পরিবর্তন আনা হয় এবং এর কারণে যদি আইফোনের কোন ক্ষতি হয়, তবে এ্যাপল দায়ি নয় এবং কোন ধরনের সার্ভিস দিতেও তারা বাধ্য নয়। বিঃদ্রঃ জেলব্রেক করা আইফোনকে রিসেট দিয়ে আবার আগের অবস্থায় নিয়ে গেলেও এ্যাপল ষ্টোরের লোকেরা নিমিষেই বলে দিতে পারবে যে ওটাকে জেলব্রেক করা হয়েছিলো কিনা। সুতরাং, তাদের কে ধোকাঁ দেবার কোন রাস্তা নাই।

৩) এ্যাপ ব্যবহারে ঝামেলাঃ ধারনা করা হয়, যেসব এ্যাপ নিরাপত্তা বা অন্যান্য কারণে এ্যাপস্টোরে এ্যপ্রুভাল পায় না, সেগুলোই পরে Cydia, বা Pangu বা TaiG তে গিয়ে ঠাইঁ নেয়। যার ফলে, অনেক এ্যাপই ক্রাশ করে, মেলওয়্যার বা স্প্যাম থাকে। Cydia Store এ এ্যাপলের মতো নিরাপত্তার ব্যাপারে কোনরকম কড়াকড়ি নাই, যার ফলে যে এ্যাপটার কোনই সিকিউরিটিই নাই, সেটাও সেখানে স্থান পায়। যেটা এ্যাপ স্টোরে কখনই সম্ভব ছিলো না। তাইতো দেখা যায়, আইফোন ইউজার হয়েও জেলব্রোকাররা অভিজ্ঞতা পান এন্ড্রয়েন ইউজারদের মতো। আমি যেহেতু কোনদিন জেলব্রোকেন এ্যাপ ইউজ করিনি, সেহেতু আমি জানি না এই অভিযোগ কতটা সত্যি। যারা করেছেন, তারা ভালো বলতে পারবেন। জেলব্রেকিং নিয়ে আমার ধারনা এতটাই কম যে, আমি শুধু জানি দুটি পদ্ধতিতেই মূলতঃ জেলব্রেকিং করা হয়।

ক) http://evasi0n.com/

খ) http://www.redsn0w.us/

উপরিউক্ত পদ্ধতিদ্বয়ের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাইলে গুগলে সার্চ করে দেখতে পারেন।

৪) জেলব্রোকেন এ্যাপস নতুন iOS – এ কাজ করে নাঃ জেলব্রেক করা আসলে ইদুঁর-বেড়াল খেলায় শামিল হওয়া। কারন আপনি যদি জেলব্রেক করা অবস্থায় নতুন iOS এ আপডেট দিতে চান তো সেটা আপনি কিছুতেই পারবেন না, যদি না জেলব্রেক ভার্সনটাও নতুন iOS এর জন্য কম্পাটিবেল হয়। এই কারণে আপনাকে মাসের পর মাসও অপেক্ষা করতে হতে পারে। আমি অনেককে জানি, জেলব্রোকেন ফোন iOS আপডেট দিতে গিয়ে বিরাট বিপদে পড়েছেন। এমনও অবস্থা হয়েছে গেছে, আপডেটের মাঝখানে সেট হ্যাং করেছে এবং সেটা সারাতে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে। তাছাড়া, জেলব্রোকেন এ্যাপস ঘন ঘন আপডেট করা হয় না, যেমনটা করা হয় iOS ‍এ, এর নতুন আপডেট মানেই হচ্ছে জেলব্রেকারদের জন্য একটা বাড়তি ঝামেলা। অথচ আইনসিদ্ধ ইউজারদের জন্য সেটা আর্শিবাদ বৈ অন্য কিছু নয়।

৫) ব্যবহারে অসামঞ্জস্যতাঃ অনেক সময় ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ হয় না, ব্যাটারি ব্যাকাপও ভালো পাওয়া যায় না, এমনকি এ্যাপল স্টোর থেকে পয়সা দিয়ে কেনা এমন এ্যাপও ক্রাশ করে বা আইফোনের অনেক ফিচারই ঠিকঠাকমতো কাজ করে না। এছাড়াও, আইফোন স্লো হয়ে যাওয়া, টাচস্ক্রিন কাজ না করা, ঘন ঘন হ্যাং হয়ে যাওয়া ইত্যাদি অভিযোগ প্রায়ই জেলব্রেকাররা করে থাকেন।

তবে বেশীরভাগ জেলব্রোকাররা সবচেয়ে বেশী যেটা নিয়ে অভিযোগ করেছেন সেটা হচ্ছে, জেলব্রেক করার পর তাদের ব্যাটারি স্বাভাবিকের চাইতে কয়েকগুন দ্রুত ড্রেইন হয়েছে। একবার ফুল চার্জ দিলে অনেক সময় দিনের তিন এক ভাগের এক ভাগও যায় না। (স্বাভাবিক ব্যবহারে)

৬) Find My iPhone কাজ করবে নাঃ এই এ্যাপটি দিয়ে যেসব সুবিধা পাওয়া যাবে, সেগুলো জেলব্রেক করা ফোনে পাওয়া যাবে না। যেমনঃ হারানো ফোন লাইভ ট্র্যাকিং করা এবং ফোনের মেমরী মুছে ফেলা। উল্লেখ্য, হারিয়ে যাওয়া ফোন ট্র্যাক করার হয়তো অনেক এ্যাপই Cydia তে পাবেন কিন্তু তার কোনটাই আপনাকে আইফোনের মমরি মুছে ফেলার অপশন দিবে না। এটা একমাত্র পাবেন এ্যাপলের নিজস্ব এ্যাপ Find My iPhone. প্রশ্ন করতে পারেন, মেমরী ইরেজের লাভ কি? সেই প্রশ্নের উত্তরসহ এই এ্যাপটির ব্যাপারে বিস্তারিত লিখেছিলাম একবার। সেটা এখান থেকে পড়া যাবে।

৭) ভুলভাবে জেলব্রেক করে দিতে পারে আপনার দামী ফোনটার সর্বনাশঃ ইন্সটল করার ফলে বা ক্রুটিপূর্ণ টুইক ব্যবহারের ফলে আপনার শখের দামি আইফোনটি এক টুকরো ইটে পরিনত হতে পারে, মানে যেটা দিয়ে আপনি কিছুই করতে পারবেন না আসলে। আর একবার যদি এমন হয়, তবে সেটা যতই ফ্যাক্টরি রিসেট দেন কোন লাভ নাই। আপনি যদি না জানেন যে আপনি আসলে কি করছেন, তাহলে আপনার বড় ধরনের বিপদ হতে পারে।

এ্যাপলের ওয়েব সাইটেও জেলব্রেকিং সমন্ধে স্পষ্ট সাবধানবানী রয়েছে।

৮) জেলব্রেক করা দন্ডনীয় অপরাধঃ আমেরিকার আইনানুযায়ী, যে কোন ধরনের ট্যাবলেট ডিভাইসকে জেলব্রেক করা নিষিদ্ধ, কেউ করলে তাকে জেল-জরিমানা গুনতে হবে। কিন্তু ইংল্যান্ডে এই আইনটির ব্যাপারে পরিস্কার করে কিছু বলা নেই। মানে সেখানকার ব্যবহারকারী যদি তাদের ডিভাইস জেলব্রেক করেন তাহলে কি ধরনের আইনী ঝামেলা তাদের পোহাতে হতে পারে, সে ব্যাপারে কেউই অবগত নন। সুতরাং, UK ইউজারদের জন্য জেলব্রেকিং হলো একটা Legally Grey Area.

৯) জেলব্রোকেন ডিভাইসে iCloud সার্ভিস কাজ করে নাঃ এ্যাপেল বলেছে, “Push-based services such as iCloud and Exchange have experienced some serious ‍problems synchronizing data with their respective servers”. এই কারণে অনেক সময় দেখবেন, আপনার ফটো ফোল্ডারে রাখা ছবি বা ফোনের কনটাক্ট বা ক্যালেন্ডারা জমানো ইভেন্ট ইত্যাদি জেলব্রোকেন ডিভাইসে iCloud এর সাথে যথাযথভাবে Sync করতে পারছে না। আর ডেটা সিঙ্ক ঠিকভাবে না হলে দরকারের সময় জরুরী ডেটা হাতের কাছে পাবেন না।

১০) একটা দুঃখজনক সিনারিওঃ ধরেন কেউ একজন তার আইফোনটি জেলব্রেক করলো আইফোনের ওয়্যারলেস ফার্মওয়্যার হ্যাক করার জন্য। কোন একটা কারণে তার প্রয়োজন হয়েছে ওয়ারলেস ফিচার জেলব্রেক করে ব্যবহার করা। তো কাজ শেষ হবার পর সে আইফোনটি বিক্রি করে দেয় অন্য একজনের কাছে। এবং সেই আইফোনের ওয়ারেন্টি আছে, তাই সে ভালো দামও পেলো। তো ঐ আইফোনের নতুন ব্যবহারীরি যখন নতুন iOS এ আপডেট দিলো (কারন ঐ বেচারা জানে না এটাকে জেলব্রেক করা হয়েছে], তখনই দেখলো যে তার ফোনের ওয়ারলেস ফিচার এবং ব্লুটুথ ফিচার দুটিই আর কাজ করছে না। [উল্লেখ্য, আইফোনের ওয়্যারলেস এবং ব্লটুথ একই চিপসেটে থাকে, যার ফলে হয় দুটোই একসাথে কাজ করে নতুবা কোনটাই কাজ করে না।] তো যেহেতু ‍ওয়ারেন্টি আছে, সেহেতু সে ওয়ারেন্টির জন্য গেলো এবং ফোনটি জেলব্রেক করা হয়েছে জানিয়ে এ্যাপল তাকে সার্ভিস দিতে অস্বীকৃতি জানালো। এখন বলেন, জেলব্রেকের নিরীহ শিকার হলো কে?

এই ঘটনা এই কারণে বল্লাম, অনেকেই উল্টাপাল্টাভাবে জেলব্রেক করতে গিয়ে বা আবজাব টুইক ইনসটল করে নিজেদের আইফোনের বারোটা বাজায়। তাতেও আসলে সমস্যা নেই, সমস্যা হলো তারা সেটাকে পরে আর না ইউজ করতে পেরে বিক্রি করে ফেলে, [পড়ুন’গছিয়ে দেয়’], তখন দেখা যায় সে লোক কিনেছে সেই লোক বিপদে পড়েছে। ভাই কি দরকার আছে এইসবের?

যারা শুধু ফ্রিতে এ্যাপ পাবার জন্য জেলব্রেক করেন তাদের বলি, একটু morally চিন্তা করেন। বাংলাদেশী ডেভোলপারদের বানানো কোন ভালো মানের ফ্রি iOS এ্যাপ নাই কেন জানেন? কারন আপনার-আমার মতো কিছু মানুষ ফ্রিতে এ্যাপ খেতে গিয়ে তাদের পেটে আমরা ক্রমাগত লাথি মারছি। আপনি ১০০ টা ফ্রি এ্যাপ নামিয়ে অন্ততঃ ১ টা এ্যাপ টাকা দিয়ে কিনুন, [দেশে সস্তায় এ্যাপ ষ্টোরের গিফট কার্ড পাওয়া যায়] সমস্যা নেই। কিন্তু সারাজীবনই যদি ফ্রি এর উপর চলতে চান তো সেই লোকগুলো কিভাবে বাচঁবে বলেন? তারাও তো আপনার আমার মতই মানুষ, তাদেরও কাজ করে খেতে হয়, তাদেরও একটা পেশাগত জীবন আছে।

আপনি যে টাকা দিয়ে এ্যাপ কিনবেন, সেই টাকার উপর তারা নির্ভরশীল। তাই বলে ভাববেন না, টাকা দিয়ে এ্যাপ কিনে তাদেরকে বিরাট ফেভার করছেন। না ভাই, টাকা দিয়ে এ্যাপ কিনে আপনি তাদের প্রাপ্যটাই তাদেরকে দিচ্ছেন। কারন একটা ভালো মানের এ্যাপের পেছনে যে কি পরিমান মেধা, শ্রম আর অধ্যবসায় দিতে হয় সেটা আপনি তাদের জাগায় না থাকলে কোনদিনও বুঝবেন না। সবাই যদি ফ্রি এ্যাপ পাবার জন্য জেলব্রেক করে তো অনেক সৃজনশীল এ্যাপ ডেভেলপারদেরই পেটের তাগিদে অন্য রাস্তা ধরতে হবে। টাকা খরচ করে সফটওয়্যার কেনার মতো মানসিকতা আমরা যতদিন না অর্জন করতে পারবো, ততদিন পর্যন্ত আমরা আইটি সেক্টরে পুরোপুরি সফল বলতে পারবো না।

প্রসঙ্গত একটা তথ্য দেই, এ্যাপ কেনা বাবদ অর্থের পুরোটা ডেভেলপার পান না। একটা বড় অংশ এ্যাপল কেটে রাখে। এবং ডেভেলপারদের একটা বাৎসরিক চাদাঁ দিতে হয় এ্যাপ ষ্টোরের জন্য।

জেলব্রেকিংয়ের ক্ষতিকারক দিকগুলো নিয়ে যতটা সম্ভব তথ্যবহুল আলোচনা করার চেষ্টা করলাম। এরপরও আপনার সাধের আইফোনটিকে জেলব্রেক করবেন কিনা, সেটা আপনার বিবেচনা।

আর যদি একান্তই জেলব্রেক করতে চান তো আমার পরামর্শ হলোঃ

ক) খুব বাধ্য না হলে জেইল ব্রেক করবেন না। অর্থাৎ, এমন একটা ’গুরুতর’ প্রয়োজন দেখা দিলো যেটা পেতে হলে জেলব্রেক না করে উপায় নেই। তখন করবেন। এবং প্রয়োজন মিটে গেলে একটা ফ্যাকটরি রিসেট মারবেন। ব্যস আর জেলব্রেকমুখো হবেন না।

আইফোনের লুক ভালো করার জন্য, ফ্রি আবজাব এ্যাপ নামানোর জন্য ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় কাজে জেলব্রেক করে বেহুদা আইফোনকে ঝুকিঁর মুখে ফেলে কি লাভ বলেন? কষ্টের টাকা দিয়ে কিনেছেন আইফোন। অবশ্য ফ্রি পেলে (যেমনঃ গিফট, চুরি করা ফোন ইত্যাদি) ভিন্ন কথা।

খ) জেলব্রেক করার আগে ভাল করে সে বিষয়ে পড়াশোনা করেন, নেটে ঘাটাঘাটিঁ করেন, ইউটিউবে ভিডিও দেখেন। নিজে না পারলে দরকার হলে অভিজ্ঞ কোন বন্ধুর সাহায্য নিন। কেননা, ভুল পদ্ধতিতে জেলব্রেক করতে গিয়ে বিরাট ধরা খেয়েছেন এমন লোকের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

গ) জেলব্রেক করার পর হাতের সামনে যে টুইক পান সে টুইকই ব্যবহার করতে যাবেন না। টুইকটা নিয়ে কিছু ষ্টাডি করেন, টুইকটা যে ডেভোলপার বানিয়েছে তার ব্যপারে একটু খোজঁ খবর নিন, রেটিং ভালো না থাকলে বা খুব বেশী লোকে ইউজ না করলে ঐ টুইক ব্যবহারের চিন্তা না করাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। উল্টাপাল্টা টুইক ব্যবহার করে ধরা খেয়েছেন এমন লোকের সংখ্যা কিন্তু অগুনিত। এক্ষেত্রে একটা প্রবাদবাক্য প্রণিধানযোগ্য, সাবধানের মাইর নাই। সুতরাং, সাবধান থাকুন।

জেলব্রেকারদের ভাগ্য ভালো যে পুরো প্রসেসটাই reversible, মানে আপনি চাইলেই রিষ্টোর দিয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারবেন। এটা একটা আশার কথা। জেলব্রেকিং প্রসেস reversible না হলে কি তাদের কি ভয়ানক দুর্দশা হতো সেটা ভাবাও যায় না।

উপসংহারঃ প্রথম দিকে অনেক সাধারন কাজ করতেও জেলব্রেক করা লাগতো, কিন্তু এখন iOS অনেক ডেভোলপ করেছে, আগে যেসব কাজ করতে জেলব্রেক করা লাগতো, সেসব এখন জেলব্রেক ছাড়াই করা যায়। এ্যাপলই সে সুযোগ আপনাকে দিচ্ছে এবং ভবিৎষতে হয়তো জেলব্রেক করার প্রয়োজনীয়তাই পুরোপুরি ফুরিয়ে যাবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, আইফোনকে যে রকমটা বানানো হয়েছে সে তেমনটাই ভালো। যে ব্যক্তি যে জিনিস বানিয়েছে এবং ডিজাইন করেছে, সে-ই সবচেয়ে ভালো জানে যে সেটা কিভাবে সবচাইতে ভালো চলবে। এর উপর খোদকারী করাটা বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কোন সুফল বয়ে আনে না, এটা হয়তো অনেকেই স্বীকার করবেন। তাই জেলব্রেক করা ছাড়াই আমি আমার আইফোন নিয়ে এখন পর্যন্ত পরিপূর্ণ তৃপ্ত। এবং একেবারে বাধ্য না হলে কখনই জেলব্রেক করার ইচ্ছে নেই।

এই লেখার পূর্ণ স্বত্ত্বঃ প্রলয় হাসান

 

Comments

comments

error: Please dont copy DhakaTonic! কপি করে লুজার রা!