ভালোবাসা আর অর্থ-বিত্তের নিক্তি

love-money-conceptual-illustration-prostitution-45735493
আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যে অর্থ বিত্ত আর ভালবাসাকে একই দাড়িপাল্লায় মাপার একটা অসুস্থ্য চর্চা আদ্যিকাল হতেই বিদ্যমান। জীবনে যথেষ্ঠ পরিমান প্রাচুর্যের মধ্যে থাকতে না পেরে কিংবা নিজের সৌখিন চাহিদাগুলোকে না মেটাতে পেরে অনেকেই প্রেম পীরিতের গুষ্ঠি উদ্ধার করেন। ভাবেন টাকা পয়সার কাছে ভালবাসা আসলে বালছাল। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে, এই জাতীয় মানুষগুলো ভালবাসাকে বিলাসীতা হিসেবে দেখে অভ্যস্ত, লাইফের বেসিক নিডস হিসেবে না। অথচ আমার ধারনা, ভালবাসা এবং টাকা পয়সা উভয়ই জীবনের মৌলিক চাহিদা। কারন, ভালবাসাহীন একজন মানুষ কতটা অসহায়, (ক্ষেত্র বিশেষে ভয়ংকর) সেই রকম উদাহরন আপনার আশে পাশে তাকালেই বিস্তর দেখতে পাবেন। 🙂
 
জীবনে প্রচন্ড আর্থিক কষ্টের ভেতর দিয়ে এই পৃথিবীর বেশীরভাগ মানুষকেই যেতে হয়, হয়েছে। তার মানে এই নয় যে তার কাছে ভালোবাসা মূল্যহীন কিংবা অপাংতেয়। যদি সে তেমন কিছু বলে, তবে বুঝতে হবে সে সেটা ক্ষোভ থেকে বলেছে। আসলে দুইটার সাথে তুলনাই করা উচিত না। এই ধরনের স্থুল চিন্তা ভাবনা তারাই করে যারা আর্থিক কষ্টটাকে দিনের পর দিন ভালবাসা দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করে করে ক্লান্ত ও ব্যর্থ হয়ে দিন শেষে টাকা পয়সাকে ভালবাসার সাথে উদ্ভট তুলনা করে “ভালোবাসার কাছে টাকা পয়সা কিছুই না” জাতীয় কথাবার্তা বলে মিছে তৃপ্তি পাবার চেষ্টা করে।
 
টাকা পয়সার কাছে ভালবাসা তুচ্ছ – ধরুন, এই কথাটা একটা উন্নত দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া টাক মাথার আধবুড়ো লোকটার কাছে গিয়ে বলেন। তার দুই দেশে ফ্ল্যাট আছে, বছরে ইনকাম কোটি টাকা। সে তার জীবন যৌবন সব খরচ করেছে উন্নত দেশের নাগরিক হতে গিয়ে। যখন ’যথেষ্ঠ সার্মথ্যবান’ হয়ে বিয়ে করতে গেলেন, ততদিনে বয়স শেষ। প্রেম করার বয়সে সে টাকার পেছনে ছুটেছে, যখন টাকা ভোগ করার বয়স তখন সে প্রেম করতে চেয়েছে। যার ফলে, এমন একটা বউ সে পেয়েছে যে তার টাকা দেখে তাকে বিয়ে করেছে। তার প্রেমে পড়ে নয়।
 
এই লোকটাও কিন্তু বুঝে, কোটি টাকা ছিটালেও সত্যিকার প্রেম কিন্তু সে আর কখনো পাবে না। কারন জীবনে টাকা কামানো ছাড়া সে আর কিছু করতে শেখেনি। সেই লোকটা জানে না কিভাবে একজন নারীকে তুমুলভাবে ভালবাসতে হয়, কিভাবে আকাশ পাতাল রোমান্টিক হতে হয়। কিভাবে ভালবাসার মানুষের জন্য বৃষ্টির দিনে অথবা জোৎস্না রাতে পাগলামি করতে হয়। অথচ যে মেয়েটা আজীবন সুন্দরী ট্রফি ওয়াইফ হিসেবে কাটাবার বাসনা নিয়ে একজন ধনীলোককে বিয়ে করে, দিন শেষে সেও চায় তার স্বামী তার সাথে প্রচন্ড রোমান্টিক হোক, She wants her man to make her feel someone very special to him.
 
কিন্তু আমরা ধরেই নিয়েছি, কোটিপতি পাত্র মানে আমাদের মেয়ে থাকবে দুধে ভাতে, আজীবন পায়ের উপর পা তুলে খাবে। হয়ও তাই, কোটিপতি স্বামী তার ট্রফি ওয়াইফ আপদমস্তক সোনার গহনায় মুড়ে রাখে, মাসে দু বার করে হিল্লী দিল্লী ট্রিপে যায়, আর সবার চোখ টাটায়। কিন্তু সেই সংসারে যে ‍সুখ আর প্রেমটুকু উধাও, বিদায় নিয়েছে চিরতরে, সে কথা জানে ঐ আধবুড়ো লোকটার সিগারেটের ধোয়া কিংবা মদের গ্লাসটা, আর জানে তার ঐ ট্রফি ওয়াইফের বিছানার বালিশের কভারটা, যেটা প্রতি রাতে কান্নায় ভিজে উঠে….
 
অনেক সময় দেখবেন, অনেকে বলে জীবনে বহুত টাকা পয়সা কামাইসো, এবার তোমার একটা ভালো/সুন্দরী বউ দরকার। কিন্তু কখনো কি কাউকে বলতে শুনছেন, ’জীবনে বহুত টাকা পয়সা কামাইসো, এবার তোমার চমৎকার একজন নারীর ভালোবাসা দরকার’?
 
মোদ্দা কথা হলো, the grass always looks greener on the other side of the fence. মধ্যবিত্তরা ধনীদের সাথে তুলনা করে লাইফষ্টাইল বা ক্রাইসিসের হাহাকার করে, আর ধনীরা ভাবে অর্থই অনর্থের মূল।
 
এইটার ছোট্ট একটা উদাহরন দেই। আমার বন্ধুর আপন চাচা, বাংলাদেশের অন্যতম বড় একটা গ্রুপ অব ইন্ড্রাষ্টির মালিক, সে আজ ৯ বছর যাবত রাতে ঘুমাতে পারে না। তার ইনসমনিয়া ভয়াবহ লেভেলে গিয়ে ঠেকেছে। অনেক চেষ্টা টেষ্টা করার পর এক দেড় ঘন্টার ঘুম হয়, তারপর সারা রাত পায়চারি করে। ২৪ ঘন্টার ভেতর তার ঘুম হয় ঐ ১ কি দেড় ঘন্টা। দুনিয়ার হেন কোন ডাক্তার কবিরাজ নাই যা সে দেখায়নি। এত অল্প ঘুমিয়ে এতটা বছর ধরে সে কি করে বেচেঁ আছে, সেটা একটা রহস্য বটে। তবে পরিমিত ঘুমের অভাবে তার ভেতরে অদ্ভুত সব রোগ বাসা বেধেছেঁ। যেগুলোর কারনে তাকে দৈনিক যতটুকু ফুড খেতে হয়, তার চাইতে অনেক বেশী খেয়ে হয় মেডিসিন।
 
সেদিন তার বাসায় গিয়ে দেখি আংকেল তার বনানীর ডুপ্লেক্স বাড়ীর বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে দুপুর বেলা সামনের রাস্তার দিকে আনমনে তাকিয়ে একজন রিকশাওয়ালার ঘুম দেখতেছিলো। রিকশাওয়ালা তার রিকশার উপর পা তুলে আরামে ঘুমাইতেসে। আমি বাজী ধরে বলতে পারি, আংকেল যদি ঐ রিকশাওয়াকে উঠিয়ে ওখানে ঠিক তার মতো করেই রিকশার উপর পা তুলে ঘুমাবার চেষ্টা করে, সে পারবে না ঘুমাতে। কারন যে সম্পদটার কারনে ঐ রিকশাওয়ালা এই গরমের দুপুরেও আরাম করে রাস্তার উপর ঘুমাচ্ছে, সেই সম্পদ তো জগতের সব ধনী লোকের থাকে না। আংকেলেরও নাই।
 
স্রষ্টা মাঝে মাঝে খুব চমৎকার ব্যালান্স করতে পারেন। টাকা পয়সা না থাকলে আপনাকে সে এমন কিছু সম্পদ দিবে, যেটা টাকাওয়ালাদের কাছে নাই। কি নাই সেইটা হয়তো আপনি জানেন না, কিন্তু ঐ টাকাওয়ারারা জানে।
 

Comments

comments

error: Please dont copy DhakaTonic! কপি করে লুজার রা!