ওয়েডিং ফটোগ্রাফিতে আরোও পেশাদার হউন

Professionalism

আজ আমরা পাঠকদের কোন লাইন বাই লাইন টিপস দিবো না। আজ কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলবো। পেশাদারিত্ব নিয়ে। বিশেষ করে  ওয়েডিং ফটোগ্রাফি পেশার ব্যাপারে।

অনেক মানুষকেই দেখি নিজের পেশা নিয়ে বিতৃষ্ণা, বেতনের অংকে অস্তুষ্টি বা অফিসের বসের উপর রাগ ইত্যাদি পেশাগত ঝামেলা নিয়ে মুখে তুবড়ি ফোটায় অথচ আমাদের দেশের বেশীরভাগ পেশাজীবিদের মাঝেই যে প্রফেশনালিজমের বড্ড অভাব রয়েছে, এই ব্যাপারটা নিয়ে তেমন কাউকে উচ্চ্য বাচ্চ্য করতে দেখি না খুব একটা। এটা নিয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে আছে কারন দেশের বাইরে ও ভেতরে উভয় জায়গাতেই অফিসিয়াল রিক্রুটিং প্রসেসের সাথে আমার সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বলা বাহুল্য, অষ্ট্রেলিয়ার ভেতরে সে অভিজ্ঞতা রীতিমতো চমকপ্রদ হলেও দেশের ভেতরে সে অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর নয়। যা হোক আপাততঃ ফটোগ্রাফারদের কথাই ধরি।

আমাদের দেশের খুব নামকরা একাধিক ফটোগ্রাফার ১ মাসের কথা বলে ক্লায়েন্টকে তার বিয়ের ছবি ডেলিভারী দিয়েছে প্রায় ১ বছর পর, এমন  নজিরও  আছে। “ই” আদ্যোক্ষরযুক্ত একজন স্বনামধন্যা নারী ফটোগ্রাফার আমার এক ছোট বোনের বিয়ের ছবি ডেলিভারী দিয়েছে ১১ মাস পর!  তাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দেখা হবার পর জানতে চাই তার বিয়ের ছবিগুলো  কেন গত সপ্তাহে  ফেসবুকে দেখলাম? আরো আগে কেন নয়?  আমাকে বলা হলো, সেগুলো হাতে পেয়েছেই সপ্তাহ খানেক আগে!!!

অথচ তাকে প্রায় ফুল পেমেন্টই করে দেয়া হয়েছিলো বিয়ের অনুষ্ঠানের আগেই। আমার জন্য ব্যাপারটা ছিলো মুটামুটি অবিশ্বাস্য!! কারন এত দেরীতে ছবি দেবার কি কারন থাকতে পারে সেটা অনেক মাথা ঘামিয়েও বের করতে পারি নাই। অথচ দেরীতে পন্য বা সেবা দেয়াটা, বা ডেড লাইন মিস করাটা যে কোনমতেই পেশাদারিত্বের মধ্যে পড়ে না, আমার ধারনা সেটা খুব সংখ্যক ফটোগ্রাফারই বুঝেন।

যা অবস্থা দেখি এখন, যে যত বেশী গিয়ার আর যত দেরীতে মাল ডেলিভারী দিতে পারবে, তার সার্ভিস চার্জ তত বেশী। অথচ বিদেশের মাটিতে দেখছি, হাই ভ্যালু ফটোগ্রাফাররা মাত্র ৩-৭ দিন সময়ের ভেতর ডেলিভারী দিয়ে দেয়। কারন ডেড লাইন মিস না করাটাই তাদের কাছে প্রফেশন। এমনকি এমনও দেখেছি, ডেড লাইনের দুয়েক দিন আগেই তারা ছবি পৌছেঁ দিয়েছে। অপরদিকে, আমাদের দেশে কোন নামকরা ফটোগ্রাফার ডেড লাইনের আগে ছবি ডেলিভারী দিয়েছে, এইরকম ঘটনা এখন পর্যন্ত আমি শুনিনি। কেউ শুনে থাকলে জানায়েন প্লিজ।

4619870811_bb982f2131_z

যারা দীর্ঘদিন ধরে আউটসোসিং করেন, তারা অন্ততঃ একটু হলেও জানেন, ডেড লাইন মিস করার ক্ষেত্রে বিদেশী গ্রাহকরা জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলে। আপনি যত ভালো পন্যই ডেলিভারী দেন না কেন অথবা আপনি আপনার পেশায় যত দক্ষই হোন না কেন, ডেড লাইন মিস করেছেন তো মরেছেন। অনেক সময় ক্লায়েন্টের সাথে সম্পর্ক ভালো থাকলে হয়তো বেহুদা ডেড লাইন মিস করলে বিলের পরিমান অর্ধেকে নেমে আসে কিন্তু বেশীারভাগ সময়ই চুক্তি পুরোপুরি বাতিলই হয়ে যায়।

যা বলছিলাম, ফটোগ্রাফারদের কথা। আমাদের দেশের ওয়েডিং ফটোগ্রাফারদের দেখেছি, ফটো রিটাচ করতে করতে সেইটারে মুটামুটি ম্যানুপুলেশনের পর্যায়ে নিয়ে যায়। আর বিয়ের কন্যা কালো হলো বা মুখে ব্রণ থাকলে কি করে সেইটা আর নাইবা বল্লাম। অবশ্য তাদেরো দোষ না। এক্ষেত্রে দোষ মনে হয় আমাদের দেশের বর্ণবাদী ক্লায়েন্টরই। আমি এমনও দেখেছি যে, এজেন্সির সাথে বিয়ের বর কথা বার্তা পাকা করার সময় বার বার করে ফটোগ্রাফারদের অনুরোধ করছে – “ইয়ে, ভাই আপনাদের ভাবী একটু শ্যামলা। প্লিজ বিয়ের ছবিতে যেন এইটা বোঝা না যায়। এই ব্যাপারটা একটু দেখবেন।” সুতরাং, ফটোগ্রাফারদের আপ্রান চেষ্টা থাকে কালো কনেকে ধলা বানাবার। সমস্যা হলো, কনের গায়ের রংয়ের দিকে বাড়তি খেয়াল রাখতে গিয়ে অনেক সময়ই ছবির অন্য দিকের প্রসেসিংয়ে আর সময় দেয়া যায় না।

অথচ দেশের বাইরে দেখছি, ক্লায়েন্ট বার বার করে বলে – আমার ছবিগুলো যতটা সম্ভব ন্যাচারাল রাখবেন। কেউ কেউ বলে, ন্যাচারাল রেখেই সেটার ভেতর থেকে ড্রামাটিক টোন বের করে নিয়ে আসবেন। বলা বাহুল্য, কাজটা খুব একটা সোজা নয়। অষ্ট্রেলিয়াতে গত কয়েক বছর ধরে একটা ট্রেন্ড খুব জনপ্রিয়, সেটা হচ্ছে ছবিতে সামার ইফেক্ট। গ্রীষ্মের হালকা টোনের ব্যবহার ওয়েডিং ফটোগ্রাফি তো বটেই, এমনকি টিভি কর্মাসিয়ালেও ব্যাপক হারে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক ক্লায়েন্ট চুক্তি করার সময়ই আপনাকে জিজ্ঞেস করে নেয়, হালের ট্রেন্ড কি? সেখান থেকে পছন্দ মোতাবেক রিটাচিং করতে বলবে। আর ভারতীয় উপমহাদেশের ফটোগ্রাফারদের ডেড লাইন মিস করার অভ্যেস আছে, এটা তারাও এখন জানে। তাই তারা কম টাকায় মুটামুটি ভালো মানে কাজের জন্য তাদের কাছে যায়, কিন্তু চুক্তিতে উল্লেখ করে দেয়, ডেড লাইন মিস করলে মূল বিল থেকে কত টাকা কর্তন করা হবে। এটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ও ইন্ডিয়ার ফটোগ্রাফারদের জন্য যথেষ্ট অপমানজনক।

text quotes professional typography textures_wallpaperswa.com_55

অজি বেশীরভাগ ক্লায়েন্ট অত্যন্ত সচেতন। তারা রিটেন ডিড করবে, আপনি কোন গিয়ার, কোন লেন্স ইউজ করেন, কোন সফটওয়্যার ইউজ করেন, আপনার অভিজ্ঞতা কতদিনের, পোর্টফোলিও দেখা, আপনি কতটুকু ক্রিয়েটিভ – ইত্যাদি জিনিসপাতি পরখ করে। (অবশ্য আমার ধারনা, এইটা তাদের রেসিজমের এক ধরনের বহিঃপ্রকাশ। সাদা চামড়ার ফটোগ্রাফারকে এতটা ফিল্টারিংয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয় না।)

অথচ আমাদের দেশে দেখেছি, বিয়ের বর এক বা একাধিক ফটোগ্রাফার ভাড়া করেই নিজের দায়িত্ব শেষ মনে করে! ফটোগ্রাফার কিভাবে ছবি তুলছে, আম তুলছে না জাম তুলছে, ডেড লাইনের ব্যাপারে কথা হওয়া ইত্যাদি বেশীরভাগ ব্যাপারেই খবর রাখেনা। অষ্ট্রেলিয়াতে দুজন বাংলাদেশী ফটোগ্রাফার জানালেন, বর বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীনই রীতিমতো দূর থেকে ডেকে এনে একটু পর পর চেক করছে কি ছবি তোলা হয়েছে। কোনটা মনোপুতঃ না হলে, সে ছবিটা আবার তুলতে অনুরোধ করা হয়। আমাদের দেশে অবশ্য এমন টা করা হলে, ফটোগ্রাফার মনে মনে বলতো – ”এহ শালা আবার ডাক দিয়ে নিয়ে দেখে কি ছবি তুলসি। আরে শালা তুই ফটোগ্রাফির কি বুঝস? বিয়া করতে আইছস বিয়া কইরা যাগা। :/”

বন্ধু এও জানালেন, কাজের বেশী চাপ পড়ে গেছে, ডেড লাইন কিছুতেই রাখা সম্ভব হচ্ছে না সেটা ক্লায়েন্টকে বলে দিছেন? নো প্রবলেম, ক্লায়েন্ট অবধারিতভাবে বলেছে – “বেশ তুমি পরের সপ্তাহেই ছবি ডেলিভারী দাও। কিন্তু আমি চাই তোমার বাসা/অফিসে এসে দেখতে যে তুমি কাজ কতটুকু করেছো?” এবং সে সত্যি সত্যিই আপনার কাছে এসে দেখে যাবে আপনি কাজ কতটুকু করেছেন আর কতটা করার বাকী। যাদের বাসা দূরে বা সময় ম্যানেজ করতে পারবে না, তারা অনলাইনেই দেখবে। দরকার হলে স্কাইপে স্ক্রিন শেয়ার করে বা টিম ভিউয়ারে। আমরা হলে কি করতাম? চুপচাপ মেনে নিতাম। আর বাসায় বা অফিসে এসে কাজ দেখার কথা বল্লে তো ফটোগ্রাফার সাহেব বিস্তর মাইন্ড খেয়েই বসতো!

আমাদের দেশের যে কয়জন বিখ্যাত ওয়েডিং ফটোগ্রাফার আছে, আমার ক্ষমতা থাকলে তাদেরকে কিছুদিনের জন্য অষ্ট্রেলিয়াতে নিয়ে গিয়ে বলতাম ওয়েডিং ফটোগ্রাফি করতে। নিজের দেশে তারা কি রাজার হালে কাজ করছে, সেটা তো বুঝতোই, সেই সাথে পেশাদারিত্ব নিয়েও একটা ভালো ধারনা হতো। quote-professionalism-is-a-frame-of-mind-not-a-paycheck-cecil-castle-292453

শুধু যে ফটোগ্রাফারদের সমস্যা, অবশ্যই তা বলবো না আমি। আমাদের দেশের গ্রাহকরাও মাঝে মাঝে এদের সাথে এমন আরচন করেন যেন, এরা পেটের দায়ে রিকশা চালাতে না পেরে ছবি তুলতে এসেছে। টাকা পয়সা নিয়ে গ্যানঞ্জাম তো করেই, আচার আচরনটাও হয় চামারের মতো। আমার এক ফটোগ্রাফার বন্ধু, তার বাবা একজন নামকরা শিল্পপতি। নাম বল্লে অনেকেই চিনবেন। তো সে বন্ধু স্রেফ শখের বশেই ওয়েডিং ফটোগ্রাফি করতে গেছে। বেচারা ২ ঘন্টা অনেক কষ্ট করে গরমে ঘেমে ছবি তুল্ল, আর দু পক্ষের আত্নীয় স্বজন তাকে মুটামুটি চাকরের মতো খাটিয়ে ছবি তোলালো। …এই যে এদিক আসেন, এদের ছবি তুলেন, ঐ যে ওদিকে যান।…একটা ছবি তুলতে এতক্ষন লাগে নাকি? – ইত্যাদি। এরপর খেতে দিলো ড্রাইভার আর সিকিউরিটি গার্ডদের সাথে। তাও রেজালা আর রোষ্টে বাটির তলানী। বিয়ে বাড়ীতে সবশেষে খেতে বসলে যা হয় আর কি। ওর সাথে দুজন ভিডিও ক্যামেরাম্যানও ছিলো।

যা হোক বেচারা সব মেনে নিলো। ২ সপ্তাহ পর যখন ছবি ডেলিভারী দিয়ে টাকা আনতে গেলো, তাকে বলে -” আরে আপনি তো আমার নানী শ্বাশুড়ির ছোটবোনের আত্নীয়দের ছবিই তুলেন নাই। ৩ হাজার টাকা কম পাবেন “ বেচারা আর পারলো না। একদম কলার ধরে ধুম ধাম দিয়েই বসলো কয়েক ঘা। ঐ লোকের গায়ের উপর বিয়ের ছবিগুলো ছুড়েঁ দিয়ে বল্ল – ”তোর কোন টাকাই দেয়া লাগবে না। তুই ঐ টাকা দিয়ে মুড়ি খা ব্যাটা।” 

values-texto_largo_imagen1.aeaeb40a97cee773f82cfb6d9d921c9324

Comments

comments

error: Please dont copy DhakaTonic! কপি করে লুজার রা!