অভিনন্দন, স্যার বব ডিলন

বিশ্বখ্যাত আমেরিকান গায়ক, গীতিকার এবং লেখক ’বব ডিলান’ ৭৫ বছর বয়সে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কিছুদিন আগে। আমেরিকান ঐতিহ্যবাহী গানের আবহে থেকেই নতুন ধরনের কাব্যিক আবহ তৈরী করার জন্য তিনি সাহিত্যে সর্বোচ্চ এই পুরস্কারটি পান। ব্যাক্তিগতভাবে, এই সংবাদ আমাকে প্রচন্ড আলোড়িত করেছে। কারন, এই মানুষটির সাথে বাংলাদেশের ছোট্ট অথচ প্রচন্ড আবেগী একটা যোগসূত্র রয়েছে।
 
এই পোষ্টটি মূলতঃ তথ্যভিত্তিক। প্রচুর ইনফরমেশন দেবার ট্রাই করেছি। আবেগের চাইতে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যক প্রাধান্য দিয়েছি বেশী। যারা বিসিএস দিবেন আগামী বছর, তাদের কাজে আসতে পারে! 😛 তারঁ ব্যাপারে তিনটা ছোট্ট তথ্য দিয়ে শুরু করিঃ
 
১. বব ডিলান খুব সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র মানুষ, যিনি একই সাথে অস্কার পেয়েছেন, এবং নোবেলও পেয়েছেন।
 
২. তিনি ২য় আমেরিকান, যিনি সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন।
 
৩. এবং তিনি এখন পর্যন্ত একমাত্র মানুষ যিনি সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন অথচ যার মূল পরিচয় একজন গায়ক হিসেবে।
 
’কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর কথা অনেকেই জানেন। কিন্তু এর পেছনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অনেকেই জানেন না। ’কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ কে বলা হয় ইতিহাসের সবচাইতে সফল এবং প্রভাবশালী মানবিক সাহায্যগুলোর একটি। এটা তিন কারনে তাৎপর্যপূর্ণ ছিলোঃ
 
১. একটা জাতির সবচাইতে কঠিন বিপদে পাশে দাড়াঁনোর কনসার্ট ছিলো এটি।
 
২. আমেরিকান পপ গানের সাথে ভারতীয় ধাচেঁর গানের এই সম্মিলিক উপস্থাপন ইতিহাসে সেবারই ছিলো প্রথম।
 
৩. কনসার্টে অংশগ্রহণ করেন বব ডিলন, এরিক ক্লেপটন, বিলি প্রেসটনের মতো তৎকালীন হার্টথ্রব পপ গায়করা। এর আগে আর কোন কনসার্টে এতগুলো পপতারকা একত্রিত হননি। তারচাইতেও বড় ব্যাপার হলো, যে তারকাগুলো একটা গান গাইলেই হাজার হাজার ডলার পেতেন, তারাঁই সেই কনসার্টে গাওয়ার জন্য একটা পয়সাও পারিশ্রমিক নেননি। শুধু নামমাত্র কিছু অর্থ নেয়া হয়েছিলো ভারী বাদ্যযন্ত্র বহন করা, আনা নেওয়াসহ ইত্যাকার আনুষাংগিক চার্জ হিসেবে।
১৯৭১ সালে পহেলা আগষ্টে আমেরিকার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে দুটো ওপেন এয়ার কনসার্ট হয়। একটা বিখ্যাত বিটলসের লিড গিটারিষ্ট ও ভোকালিষ্ট জর্জ হ্যারিসনের পপ-রক ঘরানার গান, আরেকটা রবি শংকরের ক্লাসিক্যাল ভারতীয় সংগীত। (তিনি সেখানে সেতার বাজিয়ে তাক লাগিয়ে দেন উপস্থিত প্রায় ৪০ হাজার দর্শককে।) দুটোকে একসাথে করে নাম দেয়া হয় – ’কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। এটির আইডিয়া প্রথম মাথায় আসে পন্ডিত রবি শংকরের, তিনিই প্রথম প্রস্তাব দেন হ্যারিসনকে।
 
কনসার্টের মূল উদ্দেশ্য ছিলো, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আন্তজার্তিক সচেতনতা তৈরী করা। এবং, কনসার্ট থেকে প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশের শরনার্থী আর উদ্বাস্তুদের জন্য সাহায্য হিসেবে পাঠানো হয়।
 
আমেরিকান পপ সংগীতে সাথে ভারতীয় ক্লাসিক্যাল ঘরানার গানের এই অনবদ্য সংমিশ্রন একটা কালজয়ী ইতিহাস তৈরী করে, প্রচন্ড ইমপ্যাক্ট ফেলে সমগ্র বিশ্বের মানুষের কাছে। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামের কথা, আমাদের উপর পাকিস্থানের বর্বর নির্যাতনের কথা এই কনসার্টটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয় সমগ্র বিশ্বে। রবি শংকর প্রায়ই বলতেন, ”একদিন বাংলাদেশের নাম পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ জানবে, দেখে নিও।” (তারঁ এক্সটেনডেড প্লে এ্যালবামটিও হ্যারিসন করে দেন, যার নাম দেয়া হয় “জয় বাংলা”!
joi_bangla_sleeve
 
তারঁ ইচ্ছে ছিলো কনসার্টটি থেকে প্রাথমিকভাবে ২৫ হাজার ডলার চাদাঁ সংগ্রহ করা। কিন্তু তাকেঁ এবং কনসার্টের সমস্ত গায়ককে হতভম্ব করে দিয়ে সেই কনসার্ট আয় করে প্রায় আড়াই লাখ ডলার। সেই আমলে এই পরিমান টাকা একটা কনসার্ট থেকে উপার্জন করার কথা কেউ প্রচন্ড বিলাসী স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারতো না। কিন্তু তাঁরা তখনও জানতেন না, পরবর্তীতে এই কনসার্ট যা আয় করবে, সেটার কাছে এই আড়াই লাখ ডলারও নিতান্তই নস্যি।
the_concert_for_bangla_desh
 
পরবর্তী দেড় দশকে এই কনসার্টের এ্যালবাম বিক্রি করে, ডিভিডি মুভি বিক্রি করে কত আয় করতে পারে বলে ধারনা করেন? ১ মিলিয়ন ডলার? ৫ মিলিয়ন ডলার? নাহ।
 
১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ’কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর রেভিন্যু হয় ১২ মিলিয়ন ডলারেরও বেশী। যার সমুদয় অর্থই বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মূল কনসার্ট অনুষ্ঠিত হবার এতটা বছর পরেও আর কোন কনসার্ট এত তীব্র প্রভাব ফেলতে পারেনি এর আগে কখনো। এই কারনেই একে সেরা বলা হয়।
 
’কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ শুধু আমাদের না, সমগ্র বিশ্বের কাছে একটা এনকারেজমেন্টের নাম, বিপদগ্রস্থ মানুষের পাশে এসে দাড়াঁনোর নাম। বব ডিলান ছিলেন এই যুদ্ধের অন্যতম নায়ক। জর্জ হ্যারিসন নিজে তাকে ফোন কল করে রাজী করান কনসার্টে অংশগ্রহন করার ব্যাপারে। এবং তিনি সানন্দে রাজী হন। ৩০ বছর বয়সে সেই কনসার্টে এসে তিনি গায় – Just Like A Woman. 
 
বাকীটা ইতিহাস।
nobel-prize-literature
 
বব ডিলনকে বলা হয় – one of the best-selling artists of all time. তার গানের এ্যালবামের বিক্রি হয়েছে ১০ কোটিরও বেশী। এবং পৃথিবীর সবচাইতে বড় বড় পুরস্কারগুলো তাঁর পাওয়া হয়ে গেছে। গ্র্যামি পুরস্কার, পুলিতজার পুরস্কার, গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার … ইউ জাষ্ট নেইম ইট!
 
তাঁকে বলা হয় আমেরিকার স্মরণকালের অন্যতম সেরা লিরিসিষ্ট। কিন্তু অনেকেই জানেন না যেটা সেটা হলো, তিনি কিন্তু পেইন্টার হিসেবেও দুর্দান্ত। ১৯৯৪ সালে তারঁ সবগুলো পেইন্টিংস নিয়ে একক চিত্র প্রদর্শনী হয় বিখ্যাত সব আর্ট গ্যালারিতে।
 
বব ডিলান যেদিন নোবেল পেয়েছেন, সেদিনই তার একটা লাইভ শো ছিলো লস এ্যাঞ্জেলসে, মজার ব্যাপার হলো, তিনি তারঁ নোবেল পুরস্কার নিয়ে সেখানে একটা কথাও বলেন নি। শুধু ভিয়েতনাম যুদ্ধ নিয়ে তারঁ বানানো একটা গান গেয়েছেন দরদী কন্ঠে!
 
নোবেল পুরস্কারের মতো পৃথিবীর সবচাইতে সেরা ‍পুরস্কারকেও তিনি উল্লেখযোগ্য মনে করেননি, তার বদলে তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে গাওয়া বানী এখনো তারঁ কন্ঠে ধারণ করেন। ’কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ এর অন্যতম সফল নায়কের কাছ থেকে এটা কোন অযাচিত আচরন হতে পারে না। 🙂
 
কনগ্রেচুলেশনস, স্যার বব ডিলন। 🙂

Comments

comments

error: Please dont copy DhakaTonic! কপি করে লুজার রা!