Find My iPhone এর ব্যাপারে বিস্তারিতঃ অ্যাপটি যেভাবে কাজ করে

অ্যাপেলের নিজস্ব অ্যাপ্লিকেশন ’ফাইন্ড মাই আইফোন’ এর মাধ্যমে আপনি আপনার ফোনের রিয়েল টাইম লোকেশন দেখতে পারবেন গুগল ম্যাপে। এমনকি চাইলে ফোনে বার্তা বা এলার্ট টোনও পাঠাতে পারবেন। ফোন হারিয়ে গেলে সেই ম্যাসেজের মাধ্যমে চোরের সাথে যোগাযোগ করতে পারবেন। যদি দেখন চোর কিছুতেই সাড়া দিচ্ছে না, তখন আপনি ঘরে বসেই আপনার আইফোনটির সমস্ত তথ্য মুছে দিতে পারবেন। এর সুবিধা হলো, চোর কিছুতেই আপনার ফোনটি আর ব্যবহার করতে পারবে না। সে না পারবে সেটা বিক্রি করতে, না পারবে নিজে ব্যবহার করতে। ফাইন্ড মাই আইফোন দিয়ে মেমরি ইরেজ করার পর সেটার একটিভেশন লক হয়ে যাবে। এর মানে হলো, মূল মালিক ছাড়া দুনিয়ার আর কেউ আর সেই ফোন একটিভ করতে পারবে না। এমনকি স্বয়ং আপেলও কনা। তার মানে চোরের কাছে তখন দুটো মাত্র অপশন থাকে। ক) আইফোনটা আপনাকে ফেরত দেয়া। ২) সেটাকে পেপারওয়েট হিসেবে ব্যবহার করা অথবা শো পিস হিসেবে ড্রইংরুমে সাজিয়ে রাখা।

পুরো ব্যাপারটা কিভাবে কাজ করে, সে ব্যাপারে অনেকেরই হয়তো ধারনা নেই। তাছাড়া, সেটার বিস্তারিত বাংলা ভাষায় নেটের কোথাও লেখা নেই। এমনকি আমারও জানা ছিলো না। তাই ভাবলাম সেটা জেনে বাংলাতে একটু বিস্তারিত লেখা যাক। তো ফাইন্ড মাই আইফোন কিভাবে কাজ করে সেটা দেখার জন্য আমার পিসির ব্রাউজার দিয়ে আই ক্লাউডে ঢুকে লষ্ট মুডে গিয়ে আমার ফোনে একটা ম্যাসেজ পাঠালাম। বাংলাতে লিখলাম – ”আমি প্রলয় হাসান। আমার আইফোনটি হারানো গিয়েছে। আমার সাথে যোগাযোগের নম্বর….। আপনি ফোনটি ফেরত দিলে উপযুক্ত পুরস্কার দেয়া হবে। আপনার নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে। যদি ফেরত না দিন তবে এই ফোনটি আপনি কোনভাবেই আর ব্যবহার করতে পারবেন না।” ৫ সেকেন্ডের ভেতর হুবহু এই ম্যাসেজটিই স্পষ্ট বাংলা ফন্টে আমার ফোনের লক স্ক্রিনে আবিভূত হলো। ফোনের পাসকোড দিয়ে দিলেই ম্যাসেজটি মুছে যাচ্ছে। কিন্তু যখনি আবার পাস লকড হচ্ছে, তখনি আবার আর্বিভূত হচ্ছে। এভাবে ক্রমাগত হচ্ছে।

এরপর আমি এলার্ট টোন পাঠালাম আমার ফোনে। কয়েক সেকেন্ডের ভেতর তীক্ষ একটা আওয়াজ শুরু হলো আমার ফোনে এবং উপরে লেখা উঠলো iPhone Lost Alert. এরপর ফোনের পাসকোড দিতেই শব্দ এবং ম্যাসেজ দুটোই দূর হয়ে গেলো। [তার মানে, এই ম্যাসেজ বা টোনের হ্যাপা থেকে বাচঁতে হলে চোরকে অবশ্যই আমার চার ডিজিটের পাসকোড জানতে হবে। না জানলে, ম্যাসেজটি সরবে না এবং ক্রমাগত শব্দ হতে থাকবে। যতক্ষন ব্যাটারির চার্জ থাকবে আর কি!] আরেকটা ব্যাপার, লস্ট মুড এনাবেল করার সাথে সাথে আইফোনের লোকেশন ট্রাক করতে শুরু করে ফাইন্ড মাই আইফোন অ্যাপটি। মানে কোথায়, কতক্ষন ধরে কখন ফোনটা ম্যাপের কোন লোকেশনে ছিলো, সেটা দেখাতে থাকে। [গুগল ম্যাপে এই লোকশন দেখানোটা যথেষ্টই নিখুতঁ। একদম আমার মিরপুরের বাড়ীর রাস্তাটাই দেখায়।] এমনকি, আপনার হারানো ফোনে এখন কত পার্সেন্ট ব্যাটারি আছে, সেটাও আপনি আইক্লাউড থেকে দেখতে পারবেন। পুরো ব্যাপারটি জন্যে হারানো আইফোনকে ইন্টারনেটের সাথে যু্ক্ত থাকতে হবে। চোর যখনই আপনার ফোনটি ইন্টারনেটের সাথে যু্ক্ত করবে, তখনই আপনার পাঠানো ম্যাসেজ বা টোন আপনাআপনি আইফোনে চলে যাবে, সেটা যদি ১ বছর পরও হয়।

যাইহোক, সবশেষে আমি আমার আইফোনটির একটিভিশন লক এনাবেল করে দিলাম। একটিভিশন লক এনাবেল হবার পর আপনি গুগল ম্যাপে ফোনের কোন ট্রেস পাবেন না কারন ফোনের ভেতরে জিপিএস সিগন্যালের জন্য যে ডাটাগুলো ইনসটল করা হয়েছিলো, সেটাও মেমরির সাথে মুছে গিয়েছে। কিন্তু আমি চোরকে যে ম্যাসেজটি পাঠিয়েছিলাম, সেটা কিন্তু মুছে যায়নি বরং স্ক্রিনে ভেসে ছিলো।

আমি চোরের জাগায় থাকলে কি করতাম ভাবলাম। আমি চোরের জাগায় থাকলে প্রথমে ফোনটি রিকভার মুডে নিয়ে ফ্যাক্টরি সেটিংস দেবার চেস্টা করতাম। তাই এরপর আমার আইফোনটিকে রিকভার মুডে নিয়ে গেলাম। তারপর মেনুয়ালি রিসেট করা চেষ্টা করলাম। একটুপর যখনি ফোনের উপরে একটা ম্যাসেজ ভেসে উঠলো, in order to activate your iPhone, Connect it to iTunes, তখনি বুঝলাম যে আসল ঘটনা এখনই শুরু হবে। তো আইটিউনসের সাথে লাগানোর পর পরই নীচের দৃশ্যটি দেখতে পেলাম। যাদের আইফোন নিয়ে সামান্যতম ধারনা আছে, তারা এই ছবিটি দেখেই হয়ত বুঝতে পারছেন যে, চোরের আর কিছুই করার নেই এখানে। অলরেডি এটা একটা মৃত আইফোনে পরিনত হয়েছে যেটা দিয়ে শোপিস ছাড়া আর কোন কাজেই ব্যবহার করা যাবে না। উল্লেখ্য, পিসি বা ল্যাপটপে তখন নেট কানেকশন না থাকলে, আইফোন একটিভ হবে না। ফোন একটিভ করার জন্য ইন্টারনেট কানেকশন বাধ্যতামূলক। আর ইন্টারনেটসহ আইটিউনসে কানেক্ট করলেই চোর বিপদে পড়বে।

যা হোক, আমি কানেক্ট করলাম এবং এরপর এই ছবিটি আমার আইটিউনসের পর্দায় ভেসে উঠলো।

খেয়াল করে দেখুন, এখানে বলা হচ্ছে ঐ ইউজার নেম আর পাসওয়ার্ড দিয়ে লগ ইন করতে যেটা দিয়ে এই আইফোনটিকে ইরেজ করে ফেলা হয়েছিলো। চোর এখানেই ধরা। কারন সে আপনার ইউজার নেম আর পাসওয়ার্ড জানে না।  আর আইফোন একটিভেট করতে না পারলে এটার আর কোনই মূল্য নেই শো পিস ছাড়া।

আইফোন ৫ এস এ ইতিমধ্যেই যুক্ত হয়েছে ফিংগারপ্রিন্ট স্ক্যানার। মানে আসল মালিক ছাড়া আর কারো হাতে সেটা খুলবে না। শুনছি আইওএস ৮ এ ক্লাউড থেকেই পাসকোড বদলানোর সুযোগ দেয়া হবে এবং চোরের অজ্ঞাতে তার ছবি তুলে আইক্লাউডে পাঠাবার চেষ্টা করবে আইফোন। ফ্রন্ট ক্যামেরা কিছুক্ষন পর পর ছবি তুলে পাঠাতে থাকবে।

অষ্ট্রেলিয়াতে দেখেছি, ফাইন্ড মাই আইফোন গুগল ম্যাপের যে ট্রেসিং পয়েন্ট দেখায়, সেটা প্রিন্ট করে থানায় জমা দিলেই পরদিন পুলিশ আসল মালিকের বাসায় এসে ফোন দিয়ে যায়। বাংলাদেশে তো আর সেটা সম্ভব না। আমি গুলশান থানার একজন তরুন পুলিশ অফিসারের সাথে আলাপ করে জানতে পেরেছি, খুব এক্সট্রিম কেস (যেমনঃ খুন বা রেইপ) ছাড়া জিপিএস ট্রাকিং করে আইফোন খুজেঁ নিয়ে আসার মতো অত সময় বা সুযোগ ডিএমপির নাই। অথচ, অ্যাপেল এই অ্যাপটি বানিয়েছেই হারানো আইফোন ফেরত পাবার জন্য। সুতরাং, বাংলাদেশে আপনার আইফোন হারানো গেলে সেটা হয়তো আপনি ফিরে নাও পেতে পারেন, কিন্তু একটা ব্যাপারে আপনি সুনিশ্চিত থাকতে পারেন যে, চোরও সেটা আর ব্যবহার করতে পারবে না যদি আপনি ফাইন্ড মাই আইফোনকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে জানেন।

Find My iPhone অ্যাপটি আইফোনে বিল্ট ইন থাকে। চাইলে আলাদা করে নামাতেও পারেন। অ্যাপস্টোর থেকে এটা বিনামূল্যে নামানো যায়। এই অসাধারন অ্যাপটি ব্যবহার করতে হলে আপনার একটি iCloud একাউন্ট থাকতে হবে। [যে কেউ চাইলেই ফ্রি আই ক্লাউড একাউন্ট খুলতে পারেন।] তারপর সেই একাউন্ট দিয়ে আইফোনে লগ ইন করলেই ফাইন্ড মাই আইফোন অ্যাপটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়ে যাবে।

একটা সাবধানতা, আমি যতদূর জানি, জেলব্রেক করা আইফোনে Find My iPhone কাজ করে না। সুতরাং, হারিয়ে যাবার পর যদি আইফোন খুজেঁ পেতে চান বা চোরকে শিক্ষা দিতে চান তবে আইফোন জেলব্রেক করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

Find My iPhone এর বিকল্পঃ প্রে. [এটাতে চোরের ছবিও পাবার সম্ভাবনা আছে কারন এই অ্যাপটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইফোনের বিল্টইন ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলে সার্ভারে পাঠায়। তবে এটার লোকেশন অ্যাকুরেসি ফাইন্ড মাই আইফোনের মতো অতটা ভালো নয়। এবং লাইভ ট্র্যাকিং আসতে বেশ সময় নেয়।]

ফোন যদি ফ্যাক্টরি আন লক করা নাও থাকে তবুও এই অ্যাপটি কাজ করবে, ওয়াই ফাইয়ের সাহায্যে। সেক্ষেত্রে হয়তো ফোনের লাইভ জিপিএস ডাটা পাবেন না। শুধুমাত্র স্থির লোকেশন পাবেন।

বিঃদ্রঃ একজন ফেসবুক ইউজারের সাথে কথপকথন হুবহু তুলে দিচ্ছি। ব্যাপারটা খুবই প্রাসংগিকঃ

তিনি জানালেন – তার ফোন হারিয়েছে কিন্তু অ্যাপটি দিয়েও চোরের কোন ট্রেইস খুজেঁ পান নি কারন চোর তার একাউন্টটিই ডিলিট করে দিয়েছে। আইফোনের লোকেশন আর দেখায় না, বলে ডিভাইস অফলাইন। সে পুলিশকে কিছু টাকা ঘুষও দিয়েছে চোর ধরার জন্য কিন্তু কোন লাভ হয় নাই।

আমার রিপ্লাই ছিলোঃ আহারে ভাই আপনার কথা শুনে খুব খারাপ লাগলো। এই কারনে ২/৩ দিনের সময় বেধেঁ দেওয়া উচিত চোরকে। এর ভেতর ফেরত না দিলে মেমরি মুছে দিবেন তাহলে সে আর সেই আইফোন দিয়ে কিছুই করতে পারবে না। ইস্টার্ন প্লাজায় নাকি আইক্লাউড লক খুলে দেয় কিন্তু সেটা খুবই খরচ এবং সময় সাপেক্ষ। কাস্টমারের সাথে চুক্তি হয়, খোলার চান্স ৫০-৫০। খুল্লে ১০ হাজার দিতে হবে। আর না খুল্লে শুধু তাদের সার্ভিস চার্জ এক দেড় হাজার টাকা। আমার জানা মতে মাত্র দু জন লোক আই ক্লাউড লক খুলতে পারছে, তাও আবার ১০/১২ হাজার টাকা খরচ করে এবং সময় লেগেছে প্রায় ১ সপ্তাহ। মোদ্দা কথা, আপনার চোরটি খুবই ধুরন্ধর সে প্রায় অসাধ্য সাধন করেছে আইক্লাউড থেকে একাউন্ট মুছে ফেলতে পেরেছে। আরেকটা কথা ভাই, ঘুষ দেয়া ও নেয়া উভয়ই কিন্তু অপরাধ।

আপনার আইফোনের iOS version কত ছিলো? আপনি কি Find my iphone রেগুলার ব্যবহার করতেন? মানে জিপিএস ট্রাকিং, নোটিফিকেশন ইত্যাদি ঠিকঠাক মতো কাজ করে কিনা সেটা টেষ্ট করেছেন কখনো? আর আপনি বল্লেন আপনি লষ্ট মুডে দিয়েছেন। লষ্ট মুড আর মেমরি ইরেজ করা কিন্তু এক কথা নয়। চোরকে বার্তা পাঠানো ছাড়া লস্ট মুডের আর কোন কাজ নাই আসলে। চোর রিপ্লাই না দিলে আপনার ফাইনাল অস্ত্র হচ্ছে, মেমরী ইরেজ করে ফেলা।

Comments

comments

error: Please dont copy DhakaTonic! কপি করে লুজার রা!